বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ও দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই কৃষি খাতের গৌরবময় ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পসমূহের সঠিক তদারকি, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নির্ধারিত সময়ে ভৌত অগ্রগতি নিশ্চিতের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে।
বুধবার রাজধানীর দিলকুশাস্থ বিএডিসির প্রধান কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনা সভায় এই দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। সংস্থাসমূহের বার্ষিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপুর্ণ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম।
সভায় বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাস্তবায়িত বিএডিসির বিভিন্ন প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নের হার এবং দক্ষতায় শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে বিএডিসি। এই অর্জনকে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যৌথ প্রচেষ্টার ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
কৃষি ও কৃষকের বিশ্বস্ত সঙ্গী বিএডিসি
সভাপতির বক্তব্যে বিএডিসি চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষিব্যবস্থার সাথে বিএডিসি নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং দূরদর্শী রূপকল্প বাস্তবায়নে যেকোনো পর্যায়েই আলোচনা অনুষ্ঠিত হোক না কেন- সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিএডিসির নাম উঠে আসে। এটি কেবল একটি সংস্থার নাম নয়, বরং দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক কৃষক এবং সরকারের শতভাগ আস্থার প্রতীক।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কৃষি খাতের বহুমুখী উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করতে বিএডিসির প্রতি সরকারের সুগভীর আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে দেশের সেচ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ এবং সার্বিক কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটি যে ভূমিকা পালন করে আসছে, তা অমূল্য। সরকারের এই অকৃত্রিম বিশ্বাস ও সংস্থাসমগ্রের সুদীর্ঘ দিনের গৌরবময় ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে বর্তমানের কার্যক্রমসমূহকে আরও সুচারু, স্বচ্ছ এবং গতিশীলতার সাথে সম্পাদন করতে হবে।
স্মার্ট ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় মহাপরিকল্পনা
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিখাতে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং ‘স্মার্ট কৃষি’ ব্যবস্থা রূপায়ণে বিএডিসি মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে বলে সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
মোঃ আজিজুল ইসলাম জানান, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক কৃষির গতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিএডিসির কাজের পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার সুনির্দিষ্ট ও গভীর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেচ অবকাঠামো, সোলার প্যানেলভিত্তিক গ্রিন এনার্জির ব্যবহার, অটোমেটেড সেচ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে উন্নত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
উচ্চ অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আমদানি নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে দ্রুত ও ফলপ্রসূ কাজ করার জন্য প্রকল্প পরিচালকদের প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয় সভায়।
দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএডিসি চেয়ারম্যান নির্দেশ দেন, দেশের চাহিদা মেটাতে মানসম্পন্ন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন ও সার্বিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ধরে কাজ করতে হবে।
বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় উৎসে মানসম্মত পাটবীজের চাহিদা মেটাতে বিএডিসির খামারগুলোকে আরও কার্যকর করার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। মানসম্মত পাটবীজ উৎপাদন বাড়িয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের দোরগোড়ায় তা পৌঁছে দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যে প্রণীত বৃক্ষরোপণের বিশাল মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিএডিসিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
জবাবদিহিতা ও সময়াবদ্ধ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
এডিপি সভার মুক্ত আলোচনায় বিএডিসির বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদের মধ্যে ভৌত অগ্রগতি নিশ্চিত করা এবং বাজেট বরাদ্দের শতভাগ সঠিক ব্যবহার নিয়ে কথা বলেন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা। বিএডিসি চেয়ারম্যান স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া বা অহেতুক বিলম্ব বরদাশত করা হবে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আরও বেশি পেশাদারিত্ব, দায়িত্বশীলতা ও উদ্ভাবনী মানসিকতার পরিচয় দিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও সুফল নিশ্চিত করাই আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।
উক্ত গুরুত্বপুর্ণ পর্যালোচনায় বিএডিসির বিভিন্ন উইং প্রধান, বিভাগীয় প্রধানগণ এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রকল্প পরিচালকগণ (পিডি) স্ব-শরীরে অংশগ্রহণ করেন। তারা নিজ নিজ প্রকল্পের সার্বিক অবস্থা, বাস্তবায়নের পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং তা উত্তরণের কৌশল তুলে ধরেন।
সভা শেষে বিগত অর্থবছরের সাফল্য অব্যাহত রেখে নতুন অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জনে সবাই মিলে একযোগে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।