বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০১:০৬ পূর্বাহ্ন
Title :
তিনি জুলাই শহীদের মা, এটি খেয়াল রেখে বক্তব্য রাখবেন: আইনমন্ত্রীকে স্পিকার জাহেদ উর রহমানের দিল্লি থেকে ফিরে আসা প্রসঙ্গে মুখ খুলল ভারত নোয়াখালীতে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ইরানের চেয়ে তুরস্ক ই’সরায়েলের বড় হুমকি: হিব্রু সংবাদপত্র পর্তুগালে অভিবাসন এখন নিয়ন্ত্রণে, দাবি সরকারের তীব্র তাপপ্রবাহে স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদারের ঘোষণা ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীর বাসে বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে খু’ন ইরানের তহবিল মুক্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র, হরমুজ প্রণালী সচল করার আভাস সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলন আদেশ বাতিল হয়নি আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

ইরানের তহবিল মুক্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র, হরমুজ প্রণালী সচল করার আভাস

  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ৭ Time View

একদিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের গোপন ও কারিগরি কূটনীতি নাটকীয় সাফল্যের মুখ দেখছে, ঠিক তখনই লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের আগ্রাসন ও ওয়াশিংটনের সাথে তেল আবিবের দূরত্বের নতুন সমীকরণ উন্মোচিত হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে কারিগরি আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তেহরানের অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনর্খোলার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সাথে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার বিপরীতে লেবানন সীমান্তে সংঘাতের আগুন আরও তীব্র করে তুলেছে ইসরায়েল। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে আরও দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক ও অস্ত্রনির্ভরতা কমানোর এক বিস্ফোরক ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের চাপ উপেক্ষা করে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সুইজারল্যান্ডে সফল বৈঠক, ইরানের তহবিল মুক্ত করছে মার্কিন প্রশাসন
দীর্ঘদিন ধরে চলা কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভেঙে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্দার আড়ালের কারিগরি আলোচনা সফলভাবে শেষ হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা হ্রাস করা এবং ইরানের জব্দকৃত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক তহবিল অবমুক্ত করা। ওয়াশিংটন নীতিগতভাবে ইরানের এই পাওনা অর্থ ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে, যা তেহরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুইজারল্যান্ডের এই কারিগরি সংলাপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ ছিল। এর পরপরই ইরানের শীর্ষ নেতা ও নীতিনির্ধারক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক বিবৃতিতে জানান, ওয়াশিংটন যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি সচল এবং নিরাপদ করতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসাথে কাজ করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর এই ঘোষণা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে কট্টরপন্থী মার্কিন নীতি নির্ধারকদের একটি অংশ ইরানের তহবিল মুক্ত করার এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছেন।

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যখন সমীকরণ বদলাচ্ছে, তখন লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা আরও রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাবাতিহ আল-ফাওকা শহরে ইসরায়েলি সেনারা আকস্মিক ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই হামলায় ঘটনাস্থলেই দুই লেবানিজ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আরও একজন।

দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল অংশ দীর্ঘ সময় ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ। গত কয়েক মাসে হিজবুল্লাহর সাথে সীমান্ত সংঘাত বাড়ার পর থেকে এই অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈরুতের পক্ষ থেকে এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। লেবানন সরকার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

লেবাননে হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরায়েলের ভেতরের ফাটলটি এবার প্রকাশ্যে এনেছেন স্বয়ং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২৩ জুন প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, গত সপ্তাহে সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন।

সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা যে লজিস্টিক বা রসদ ও সামরিক সহায়তা পেয়েছি, তার জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাদের এখন এই একমুখী নির্ভরতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে। ইসরায়েলকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি অস্ত্র উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিরক্ষা विशेषज्ञों বা বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য হোয়াইট হাউসের জন্য একটি বড় ধাক্কা। মূলত দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অবৈধ দখলদারিত্ব এবং বেসামরিক অঞ্চলে বিমান হামলা বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেল আবিবের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে আসছে। ওয়াশিংটন চাচ্ছে ইসরায়েল যেন লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান গুটিয়ে নেয় এবং আলোচনার টেবিলে ফেরে। কিন্তু নেতানিয়াহু মার্কিন এই নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উল্টো মার্কিন অস্ত্রের বিকল্প খোঁজার ঘোষণা দিলেন।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা চাপকে তোয়াক্কা না করে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। বরং সেখানে হিজবুল্লাহর সামরিক সুড়ঙ্গ, রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সার্বিক অবকাঠামো চিরতরে ধূলিসাৎ না করা পর্যন্ত অভিযান থামবে না।

বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের বিশাল অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান করছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী যদি নাবাতিহ আল-ফাওকার মতো বেসামরিক এলাকায় রক্তপাত বন্ধ না করে, তবে তেল আবিব এবং হাইফা শহরের গভীরে আরও শক্তিশালী ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হবে। ফলে এই অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

২৩ জুনের এই ভূ-রাজনৈতিক ডেটলাইন বা সময়সীমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন প্রশাসন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে এক জটিল দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি রুট বা পথ নিরাপদ রাখতে ইরানের সাথে সুইজারল্যান্ডে টেবিল বৈঠকে বসছে এবং তহবিল ছাড় দিচ্ছে। অন্যদিকে, তাদের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র ইসরায়েল এখন প্রকাশ্যেই মার্কিন নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।

নেতানিয়াহুর স্বাধীন অস্ত্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা মূলত ওয়াশিংটনকে এই বার্তা দেওয়া যে, মার্কিন প্রশাসন যদি সামরিক সহায়তা বন্ধের হুমকিও দেয়, তাও ইসরায়েল লেবানন বা গাজায় তাদের যুদ্ধংদেহী নীতি থেকে এক চুলও নড়বে না। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রাতারাতি মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন আয়রন ডোম বা লৌহ গম্বুজ ও প্যাট্রিয়ট, কিংবা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশের জোগান বন্ধ করে ইসরায়েলের পক্ষে এককভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য আসলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের কঠোর ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল মাত্র।

ইরানের তহবিল মুক্তি এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে সমঝোতার ইঙ্গিত যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, ঠিক তখনই লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং নেতানিয়াহুর জেদি মনোভাব সেই আশার আলোতে জল ঢেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন কীভাবে তেহরানের সাথে এই নতুন সুসম্পর্ক বজায় রাখবে এবং একই সাথে ক্ষুব্ধ ও নিয়ন্ত্রণহীন তেল আবিবকে শান্ত করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ও বৈশ্বিক রাজনীতির ভাগ্য।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category