দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কালো মেঘ কাটিয়ে অবশেষে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আশার আলো দেখা দিচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে- এমন জোরালো গুঞ্জনে আজ বৃহস্পতিবার এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্ট এই ইতিবাচক মনোভাবের ফলে প্রধান প্রধান সূচকগুলো নতুন রেকর্ড স্পর্শ করেছে। তবে তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কিছু সংশয় রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরু থেকেই এশিয়ার বাজারগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। বিশেষ করে দীর্ঘ ছুটির পর জাপানের শেয়ারবাজার যখন লেনদেনে ফেরে, তখন বিনিয়োগকারীদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
জাপানের প্রধান শেয়ারসূচক ‘নিক্কেই ২২৫’ ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ‘৬২ হাজার পয়েন্টের’ মাইলফলক অতিক্রম করেছে। শক্তিশালী করপোরেট মুনাফা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ এই উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে।
জাপানের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের শেয়ারবাজারও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আকাশচুম্বী আয় বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
জাপানের বাইরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ার নিয়ে গঠিত এমএসসিআই (MSCI) ইনডেক্স ১ শতাংশ বেড়ে নতুন শিখরে অবস্থান করছে। উল্লেখ্য যে, এই এক সপ্তাহেই সূচকটি প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা সফল হলে তা হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মোড়। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ আর্থিক বিশ্লেষক কাইল রড্ডা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়া হবে একটি বিশাল অগ্রগতি।
তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ অতীতেও এমন অনেক সম্ভাবনা শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেছে। যদি আলোচনা ফলপ্রসূভাবে এগোতে থাকে, তবে এশিয়ার বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বর্তমানে শান্তি প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে শুরু হওয়া বর্তমান সংঘাতটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করাই এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। তবে কিছু মৌলিক বিষয়ে এখনো অমিল রয়ে গেছে।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার মতো ওয়াশিংটনের কড়া শর্তগুলো নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
শান্তিচুক্তির খবরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে জ্বালানি তেলের বাজার। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সামান্য বাড়লেও (ব্যারেলপ্রতি ১০২.১১ ডলার), সময়ের ব্যবধানে তা আবার কমে ‘৯৮ ডলারে’ নেমে আসে।
দীর্ঘ সময় পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নামায় আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও, শঙ্কা কাটেনি। কারণ, বর্তমান দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ওসিবিসি ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দিলেও তেলের দাম রাতারাতি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না।
কারণ হিসেবে তারা জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি এবং বিভিন্ন দেশের তেলের মজুত বাড়ানোর প্রবণতাকে দায়ী করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের ক্রমবর্ধমান সুদহার এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
শেয়ারবাজারের এই চাঙাভাবের মধ্যে মার্কিন ডলারের দরে কিছুটা নমনীয় ভাব দেখা গেছে। প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান বা ‘ডলার ইনডেক্স’ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে ইউরো এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
এদিকে সবার নজর এখন জাপানি মুদ্রার দিকে। সম্প্রতি জাপানি ইয়েনের দর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাজার সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, নিজেদের মুদ্রাকে শক্তি দিতে টোকিও হয়তো বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু হস্তক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন তেলের দামের আরও পতন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদহার কমে আসা।
এশিয়ার এই উত্থানের রেশ মার্কিন বাজারেও লেগেছে। বড় বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ায় বুধবার ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো নতুন রেকর্ড গড়েছে। তবে বাজার এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের জন্য।
রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, এপ্রিলে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান বাড়তে পারে ৬২ হাজার, যা মার্চ মাসের তুলনায় (১ লাখ ৭৮ হাজার) বেশ কম। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
পরিশেষে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্বের সরবরাহ চেইন এবং জ্বালানি বাজারে স্থিতি ফিরিয়ে আনবে। তবে কূটনীতির এই পিচ্ছিল পথে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স