মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আর শুধু নক্ষত্রের নয়, বরং ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আলোয় উদ্ভাসিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নজিরবিহীন যৌথ হামলার পর ইরান এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে।
শনিবার সকালে শুরু হওয়া এই হামলা কেবল তেহরানের সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর লক্ষ্যবস্তু ছিলেন খোদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এই মহাপ্রলয়ের মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে এই কঠিন সময়ে কার পাল্লা কতটুকু ভারী? কে দাঁড়িয়েছে ইরানের পাশে, আর কারা হাত মিলিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে?
দীর্ঘদিন ধরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বজায় রাখতে ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর ওপর নির্ভর করে আসছিল। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (PMF), ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং গাজার হামাস এই গোষ্ঠীগুলোই ছিল তেহরানের প্রধান শক্তির উৎস।
কিন্তু গত কয়েক বছরে ইসরাইলের ধারাবাহিক ও শক্তিশালী হামলায় এই গোষ্ঠীগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ এবং হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের পতন ইরানকে এই অঞ্চলে অনেকটাই সামরিকভাবে একা করে দিয়েছে। যদিও তেহরান দাবি করছে তারা এখনো শক্তিশালী, কিন্তু বাস্তবতা বলছে তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্ক এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কিছুটা নিঃসঙ্গ হলেও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দৃশ্যপট ভিন্ন। রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, ‘শান্তিচুক্তি কেবল একটি অজুহাত ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসলে শুরু থেকেই এই ধ্বংসযজ্ঞের পরিকল্পনা করছিল।
মেদভেদেভ আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বয়স মাত্র ২৪৯ বছর, যেখানে পারস্য সাম্রাজ্য আড়াই হাজার বছরের পুরনো। এই ঐতিহাসিক দম্ভই ইরানকে রাশিয়ার আরও কাছে টেনে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার গতি অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পশ্চিমের দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান এবার সরাসরি কোনো পক্ষ নিতে অনীহা দেখাচ্ছে। ২০২৫ সালের সংঘাতের সময় তারা নিজেদের তেহরান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, যা ইরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যখন কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানে, তখন এই আরব দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। আবুধাবি একে ‘বিপজ্জনক উস্কানি’ বলে অভিহিত করেছে এবং জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছে।
নিজেদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে কাতার এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দোহায় বড় ধরনের বিস্ফোরণের পর তারা ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও রিয়াদ স্পষ্টভাবে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও জর্ডানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে এবং ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এই বিশাল অভিযানটি কয়েক মাসের ‘নিবিড় ও যৌথ পরিকল্পনার’ ফসল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘পিসমেকার’ ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে এখন সরাসরি তেহরানের ‘হৃদপিণ্ডে’ আঘাত হানার নির্দেশ দিয়েছেন। জার্মানি এবং ফ্রান্স ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের নিন্দা জানালেও, এই হামলায় তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে ফরাসি সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা তাদের মোতায়েনকৃত সেনাদের সুরক্ষায় যেকোনো ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সংঘাত নিরসনের কথা বললেও পরোক্ষভাবে ইরানি জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন।
ইরান এখন এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে ঘরোয়া অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের সংকট (খামেনির মৃত্যু বা অনুপস্থিতি), অন্যদিকে চারিদিক থেকে ঘিরে আসা মার্কিন ও ইসরাইলি রণতরী। উপসাগরীয় দেশগুলো যারা একসময় মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করতো, তারাও এখন ইরানের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
এই যুদ্ধ কেবল তেহরানের পতন ঘটাবে নাকি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, শনিবারের এই হামলা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
এএন