বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এখন পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া বইছে। ১৯ বছর পর ক্ষমতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিএনপি এবং এর কর্ণধার তারেক রহমানের কৌশলগত চালে রীতিমতো লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে বিরোধী শিবির।
মঙ্গলবার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের আগেই আজ সোমবার প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ কেবল একটি রুটিন পরিবর্তন নয়, বরং তারেক রহমানের সুশাসন ও কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রথম দাপ্তরিক প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আজ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে। বর্তমানে চুক্তিতে থাকা এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসানোর মাধ্যমে তারেক রহমান একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন, নতুন সরকারে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা হবে পদায়নের মূল মাপকাঠি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নাসিমুল গনির পারফরম্যান্স এবং মাঠ প্রশাসনে তাঁর যে গ্রহণযোগ্যতা, তা নতুন মন্ত্রিসভাকে গতিশীল করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে যখন বিরোধী শিবির সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে অন্ধকারে আছে, তখন এই প্রশাসনিক রদবদল তাদের স্নায়ুর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
আগামীকালকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যারা মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। তবে তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অতীতের ৬০ সদস্যের মন্ত্রিসভার ভুল তিনি করবেন না। তিনি ৩৫ থেকে ৩৭ সদস্যের একটি সুসংহত এবং স্মার্ট ক্যাবিনেট বা দক্ষ মন্ত্রিসভার মডেল অনুসরণ করছেন। এর মধ্যে ২৬ থেকে ২৭ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ৯ থেকে ১০ জন প্রতিমন্ত্রীর একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল থাকবে।
তারেক রহমান নিজেই প্রতিটি ব্যক্তির যোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করছেন। এতে স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী নেতাদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ এবং তরুণ মেধাবীদের সমন্বয় থাকছে। এই ছোট আকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বিরোধী জোটের ভাগাভাগির রাজনীতির ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে।
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপির শাসনামলকে ঘিরে যে বিতর্কগুলো ছিল, বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা বা খাম্বা বিতর্ক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা ব্যর্থতা, তারেক রহমান সেগুলোকে ইতিহাসের পাতায় চিরতরে দাফন করতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নাসিমুল গনিকে শীর্ষ আমলা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক ইমেজ বা ভাবমূর্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য। তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল অঙ্গীকার ছিল দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। তাই মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচনে তিনি যেমন কঠোর, প্রশাসনের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তিনি তেমনটাই কৌশলী।
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কার্যক্রম বিরোধী শিবিরের জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময় হিসেবে দেখা দিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার পরও তিনি দম্ভ প্রদর্শন না করে বরং জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই প্রেক্ষাপটে তিনি যেভাবে জামায়াতের আমির এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়কের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি। তাঁর এই শান্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভঙ্গি বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ করার সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। যখন বিরোধীরা আশা করেছিল তারেক রহমান কঠোর হাতে দমন-পীড়ন শুরু করবেন, তখন তিনি ক্ষমা ও ঐক্যের রাজনীতি দিয়ে মানুষের মন জয় করে নিচ্ছেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান যে সিগন্যালিং বা সংকেতের কথা বলেছেন, তারেক রহমান তা প্রশাসনিক নিয়োগের মাধ্যমেই শুরু করেছেন। নাসিমুল গনির মতো দক্ষ আমলাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব করা এবং মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞদের স্থান দেওয়া বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা। নতুন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীকাল যে সরকার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে, তার ভিত্তি হচ্ছে যোগ্যতা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্য। আজ নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগের মাধ্যমে সেই যাত্রার প্রশাসনিক শক্তিমত্তা প্রকাশ পেল।