গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করে দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
আগামীকাল মঙ্গলবার একদিকে যখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ নিয়ে দেশজুড়ে তোড়জোড় চলছে, ঠিক তখনই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি?
সংবিধানের রক্ষক এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের এই দৌড়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন দুটি নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁরা হলেন দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং শ্রমিক নেতা ও স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর দাবি, খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পাল্লা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভারী।
নতুন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদে থাকা না থাকা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা কাটতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এই ৭৫ বছর বয়সী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকলেও তিনি নিজেই সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। গত ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নতুন সরকার গঠিত হওয়া পর্যন্তই তিনি দায়িত্ব পালন করতে চান।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাতারাতি বিভিন্ন দপ্তর থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলায় তিনি অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেছেন। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার পরপরই তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। আর এতেই বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা হিসেবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম জোরালোভাবে সামনে আসছে।
৭৯ বছর বয়সী ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেন কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এই সাবেক অধ্যাপক ছাত্রজীবন থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বর্ণাঢ্য এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। এবার কুমিল্লা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়া এই নেতা এর আগে আরও চারবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের সংসদে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। প্রশাসনিক দক্ষতার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রগামী। ১৯৯১ সালে তিনি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এবং ২০০১ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বড় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়াও ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। এই পরিচয়টি তাঁকে দল ও মত নির্বিশেষে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, খন্দকার মোশাররফকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে দলের ভেতরে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল। বর্তমানে তিনি কিছুটা নিভৃতে থেকে দলের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, যা তাঁকে বিতর্কহীনভাবে বঙ্গভবনের পথে এগিয়ে রাখছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় থাকা দ্বিতীয় নামটি হলো নজরুল ইসলাম খান। শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত এই প্রবীণ নেতা বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামে সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন।
তবে বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করছে, নজরুল ইসলাম খানকে রাষ্ট্রপতি করার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা। তাঁর অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা কাজে লাগাতে তাঁকে নতুন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করার বিষয়ে জোরালো পরামর্শ রয়েছে।
আগামীকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যস্ততম দিন। সকালে সংসদ সদস্যদের শপথ এবং বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে কে হচ্ছেন চব্বিশতম রাষ্ট্রপতি।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে যার নামই আসুক না কেন, বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করছে এমন একজন ব্যক্তিত্ব বঙ্গভবনে আসুক, যিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে কাজ করবেন। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতো একজন প্রবীণ ও বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব সেই শূন্যস্থান পূরণ করবেন কি না, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।