রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ‘২৮ দফা’ শান্তি প্রস্তাবের পটভূমিতে রয়েছে মস্কোর সরাসরি অংশগ্রহণ এমন তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগে থাকা তিনটি সূত্র।
সূত্রগুলো বলছে, ওই নথিপত্রগুলো গত অক্টোবর মাসে আনুষ্ঠানিক নয়, অনানুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটনকে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং তা থেকেই এ প্রস্তাবের নকশা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে রুশ অংশ।
রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নথিপত্রগুলোতে মস্কো যে কয়েকটি শর্ত তুলেছে তার মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশ রুশ নিয়ন্ত্রণে রেখে দেওয়া।
সূত্র বলছে, এসব নথি মার্কিন প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার পর তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জেরাড কুশনার ও রাশিয়ান উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা কিরিল দমিত্রিয়েভ এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালান। পরে সেই কাগজপত্রকে আমেরিকার নিজস্ব ‘শান্তি কাঠামো’ তৈরির কাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে নথিগুলোকে গ্রহণ করে একটি সম্পূর্ণ মার্কিন নীতিমালা বানানো হয়েছে কি না এটি স্পষ্ট নয়।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অল্প সংখ্যক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নথি পর্যালোচনা করার সময়ই সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ‘রুশ শর্ত’গুলোতে ইউক্রেন প্রত্যাশিতভাবে সম্মত হবে না। সেই হুঁশিয়ারি থাকা সত্ত্বেও নথিপত্রগুলোর প্রভাব এড়ানো যায়নি বলেই মনে করছে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
সূত্র অনুসারে, কাগজপত্র পাওয়ার পর মার্কো রুবিও নিজে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে ফোন করে নথিপত্রের বিষয়টি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে জেরাড কুশনার, উইটকফ ও রাশিয়ার কিরিল দমিত্রিয়েভের মধ্যে আলোচনাও সংগঠিত হয় যা থেকে স্পষ্ট হয় যে মার্কিন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উচ্চ পর্যায়ও এ সংলাপে জড়িত ছিলেন।
ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদী দেখিয়েছেন এবং তার একটি বিশেষ দূত রুশ ও ইউক্রেনীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। ওয়াশিংটন ও ক্রেমলিনের কয়েকজন বোঝাপড়া- মধ্যস্থতাকারীর মধ্যে যোগাযোগ ট্রাম্প-প্রকল্পকে দ্রুত এগোতে সাহায্য করেছে বলে কূটনীতিকরা মনে করেন।
রুশ নথি-ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়।
সূত্র বলছে, জেনেভায় হওয়া প্রথম যুক্তরাষ্ট্র–ইউক্রেন আলাপ-আলোচনার পরে পরিকল্পনার মোট ২৮ দফা থেকে প্রাথমিকভাবে নয়টি দফা বাদ দেওয়ার কথা এসেছে একটি সংশোধনী প্রক্রিয়া যা পরিকল্পনাটিকে আরও বেশি ‘সমন্বিত’ এবং মিত্রমুখী করে তুলতে চেয়েছে ওয়াশিংটন।
তবুও অনেকেই মনে করছেন, রুশ শর্তের উপস্থিতি থেকেই পরিকল্পনাটির সংবেদনশীলতা অপরিহার্যভাবে বেড়েছে।
জেনেভায় আলোচনার পর সংশোধিত খসড়াটি ইউক্রেনীয় পক্ষ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছে কিয়েভ। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত দিক রুশ দখলকৃত কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি এতই সংবেদনশীল যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মধ্যেই এর চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো অনুমান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও ইউরোপেও পরিকল্পনাটির রুশ নির্ভরশীলতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। কিছু সিনেটর বলে দিয়েছেন, প্রস্তাবটি কোনো মার্কিন নৈতিক নকশা নয় বরং এটি ‘রুশ ইচ্ছাপূরণের তালিকা’। অনেকে আবার এটিকে কূটনৈতিক কৌশল বা দরজার বাইরে চলমান সমঝোতা হিসেবেও দেখেন।
হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তর এ অভিযোগগুলো নাকচ করেছে এবং বলেছেন, পূর্বপরিস্থিতি ও পরিবর্তনশীল শর্তে যে কোনও প্রস্তাব নিয়ে জীবনচক্রের মধ্যেই সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক।
ক্রেমলিনের একটি শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, জেনেভায় আলাপ-আলোচনার পর সংশোধিত পরিকল্পনাটি ব্যাপক পর্যালোচনার প্রয়োজন এবং আবুধাবিতে চলতে থাকা আলোচনায় রাশিয়ার প্রতিনিধি-উপস্থিতি সত্ত্বেও সেখানে শেষ পর্যন্ত যৌথ বৈঠক হয়নি।
উশাকভ বলেন, পরিকল্পনার কিছু দিক ইতিবাচক, কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
একদিকে মস্কোভিত্তিক নথি থাকায় পরিকল্পনাটি সরাসরি যুদ্ধবন্ধ ও বন্দি বিনিময়সহ নির্দিষ্ট উদ্যোগে পথ খুলতে পারে; অপরদিকে এটি ইউক্রেনীয় সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত জটিল আপসের সম্ভাবনাও জাগায়। কূটনীতিকদের ভাষায় শান্তি কাঠামোর যে কোনো খসড়া যদি বাস্তবভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটি অবশ্যই বহু দফায় সমন্বয় এবং কড়া নজরদারি ছাড়া কার্যকর হবে না।
বর্তমানে সংশোধিত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাগুলো চলমান; আগামী দিনগুলোতে আবুধাবি কিংবা জেনেভা-র মতো মধ্যস্থস্থানগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়তে পারে। কিন্তু একথাও স্পষ্ট রুশ নথিপত্রের উৎস ও প্রকৃতি, সেই কাগজের কোন অংশ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং কোন অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট ব্যাখ্যা অব্যাহত রয়েছে না।