ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিসের (ওএইচসিএইচআর) বিদায়ী প্রধান হুমা খান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় দু’জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আরোগ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক মতবিনিময় হয়।
সাক্ষাৎকালে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল জুলাইয়ের বিদ্রোহ ও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, যাতে সাধারণ জনগণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রভাবিত হয়েছেন। বিশেষভাবে তারা জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত নৃশংসতার স্বাধীন তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদনের গুরুত্বের বিষয়টি আলোচনা করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস হুমা খানের দীর্ঘমেয়াদি মানবাধিকার সেবার প্রশংসা করেন এবং উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে একটি সংকটপূর্ণ সময়ে হুমা খানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওএইচসিএইচআরের বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিশেষ করে গত বছরের জটিল পরিস্থিতিতে জনগণের প্রতি সংবেদনশীল ও প্রমাণভিত্তিক মনোভাব দেশকে শক্তিশালী মানবাধিকার রক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
দুই পক্ষের আলোচনায় জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি, চলমান গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশেষভাবে ভোটাধিকার রক্ষা, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতার বিষয়গুলোতে হুমা খান তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি বাংলাদেশের চলমান প্রক্রিয়াগুলোতে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়কারীর ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন।
এ সময় আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল দেশে বলপূর্বক গুম এবং গোপন আটক কেন্দ্রের ঘটনা। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গুম কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে কাজ করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, গুম, গোপন আটক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে একটি স্বাধীন, জবাবদিহিতাপূর্ণ এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। জনগণের আস্থা অর্জন এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
হুমা খানও এই আলোচনায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিসের কাজ কেবল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখাই নয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে মানবাধিকার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার দায়িত্বকাল শেষ হলেও বাংলাদেশের জনগণের জন্য মানবাধিকার রক্ষা অব্যাহত থাকবে।
উক্ত সাক্ষাৎ বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়কারী এবং সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোর্শেদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি আলোচনায় অংশগ্রহণ করে জাতীয় মানবাধিকার কাঠামোর কার্যকারিতা, সরকারি ও অ-সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং স্থানীয় নাগরিকদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধান উপদেষ্টা এবং হুমা খান দু’জনই একমত হন, যে মানবাধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণে একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা, কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন। তারা এটিও আলোচনা করেন যে, সরকারের সঙ্গে সংযুক্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ কার্যক্রম দেশের মানবাধিকার সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
হুমা খান বিদায়ী প্রধান হিসেবে বাংলাদেশে তার অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং চ্যালেঞ্জগুলো শেয়ার করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে কাজ করার সময় দেখা গেছে, জনগণ সচেতন, উদ্যোগী এবং মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেয়। আমার দায়িত্বের সময়কাল যদিও শেষ হচ্ছে, তবে এই দেশ আরও শক্তিশালী মানবাধিকার সংস্কৃতির দিকে এগোবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সাক্ষাতের মাধ্যমে হুমা খানের অবদানকে সম্মান জানান এবং বলেন, জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিসের উপস্থিতি এবং হুমা খানের নেতৃত্বে স্বচ্ছ কার্যক্রম দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার রক্ষার জন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশকে আগামী দিনগুলোতে আরও উদার ও মানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জন্য আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে।
সাক্ষাতের শেষে উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস হুমা খানের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে সফলতা কামনা করেন এবং হুমা খানও বাংলাদেশের মানুষের জন্য শান্তি ও মানবাধিকার উন্নয়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
উক্ত সাক্ষাৎ বৈঠক দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের নীতিমালা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জাতিসংঘ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়কে আরও শক্তিশালী করবে।