ইউক্রেনে মস্কোর তিন বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আজ শুক্রবার আলাস্কায় বৈঠকে বসবেন। দুই নেতার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের দখল করা ভূমি বিনিময় নিয়ে আলাপ হতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে এই বৈঠকে যদি যুদ্ধ নিয়ে শান্তিচুক্তি না হয়, তবে ভারতের ওপর আরও শুল্ক আরোপ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত বুধবার ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই সতর্কবার্তা দেন।
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘রাশিয়ার দখলে ইউক্রেনের বড় একটি অংশ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তারা দখলে নিয়েছে। আমরা চেষ্টা করব ইউক্রেনের জন্য কিছু এলাকা ফেরত আনার।’ এদিকে ভূখণ্ড বিনিময় হলে ইউক্রেনকেও কিছু ভূমি ছাড়তে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একাধিকবার বলেছেন, ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে যাবে, এমন কোনো চুক্তিই সফল হবে না।
গত মাসে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া যদি ৫০ দিনের মধ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে লড়াই না থামায়, তাহলে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে দেশটির ওপর। ওই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। কিন্তু মস্কোকে কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়নি। তবে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
সময়সীমা পার হওয়ার ঠিক এক দিন আগে মস্কো সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। পরে সিদ্ধান্ত হয় ট্রাম্প ও পুতিন বৈঠকে বসবেন। পুতিন এর আগে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের পূর্ব অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান তিনি। লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, ঝাপোরিজঝিয়া ও খেরসন- এগুলো রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এ ছাড়া ক্রিমিয়ার দাবিও আর রাখা যাবে না। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলে নেয় রাশিয়া।
বৈঠকটি নিয়ে ইউরোপের নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, রাশিয়া সঠিক পথে না হাঁটলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, রাশিয়া আসলে সময়ক্ষেপণ করছে এসবের মধ্য দিয়ে। কাঙ্ক্ষিত ভূখণ্ড পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা যুদ্ধ থামাবে না।
ভারতের ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ভারতীয়দের ওপর দ্বিতীয় স্তরের শুল্ক আরোপ করেছি, কারণ তারা রাশিয়ার তেল কিনছে। যদি বৈঠক ভালো না হয়, তাহলে শুল্ক আরও বাড়তে পারে।’
রাশিয়া থেকে তেল ও অস্ত্র কেনার কারণে এ মাসের শুরুতেই ট্রাম্প ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছেন। যার ফলে ভারতের ওপর মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশ। এর আগে ট্রাম্পও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মস্কো যদি শান্তিচুক্তিতে না আসে, তবে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
বেসেন্ট আরও বলেন, ‘ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন, আর ইউরোপীয়রা বাইরে বসে কেবল সমালোচনা করছেন। ইউরোপীয়দেরও আমাদের সঙ্গে মিলে এই ধরনের শুল্ক আরোপে এগিয়ে আসতে হবে।’
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারত রাশিয়ার সস্তা তেল আমদানি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক কিছুটা খারাপ হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ব্যাহত হয়েছে। ২০২৪ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির ৩৫-৪০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। ২০২১ সালে তা ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।
ভারত যুক্তি দিয়েছে, তারা একটি বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং দেশটির কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের স্বার্থে সস্তা জ্বালানি কেনা জরুরি।
তবে ট্রাম্প বলছেন, তার এই শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে মজবুত করতে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা আনতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বহুবার ভারতকে ‘শুল্ক অপব্যবহারকারী’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং দেশটির সঙ্গে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চান।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা কয়েক মাস ধরে চললেও এখনো সমাধানে পৌঁছায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা ২৫ আগস্ট ভারতে আসছেন আলোচনার পরবর্তী ধাপ শুরু করতে। তবে কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের শুল্ক কমাতে ভারতের অনীহা এই আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৭ আগস্ট থেকে ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এই শুল্কারোপ কার্যত দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে একধরনের নিষেধাজ্ঞা তৈরি করবে।
এই শুল্কের কারণে ভারত এশিয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি করযুক্ত বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠবে এবং এর প্রভাব ভারতীয় রপ্তানিনির্ভর শিল্প, যেমন বস্ত্র ও গয়না খাতে পড়বে। এর ফলে ভারতের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি