নেদারল্যান্ডসের সাধারণ নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেয়েছে ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী দল পার্টি ফর ফ্রিডোম (পিভিভি)। দলটি সমমনা দলগুলো নিয়ে একটি জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ফলে নেদারল্যান্ডসের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন দলটির নেতা গির্ট ওয়াইল্ডার্স। আর এতেই চরম আতঙ্কে ভুগছেন দেশটিতে বসবাসরত মুসলিমরা।
অভিবাসন নীতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিরোধের জেরে চলতি বছরের জুলাইয়ে নেদারল্যান্ডসে ক্ষমতাসীন জোট সরকারের পতন হয়। পদত্যাগের ঘোষণা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট।
আল জাজিরার প্রতিবেদন মতে, বুধবার (২২ নভেম্বর) নেদ্যারল্যান্ডসের পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার (২৩ নভেম্বর) ৯৮ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ইসলামবিদ্বেষী নেতা গির্ট ওয়াইল্ডার্সের দল পিভিভি ১৫০টি আসনের মধ্যে ৩৭ আসনে জয় পেয়েছে।
লেবার ও গ্রিন জোট পেয়েছে ২৫টি আসন। অন্যদিকে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের রক্ষণশীল দল পিপল’স পার্টি ফর ফ্রিডোম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (ভিভিডি) পেয়েছে ২৪টি আসন। এছাড়া এনএসসি ২০টি, ডিসিক্সটিসিক্স ১০টি ও বিবিবি ৭টি আসন পেয়েছে। সিবিএ ও এসপি ৫টি করে আসন পেয়েছে। এফভিডি, পিভিবিডি, ডেন্ক, সিইউ ও এসজিপি ৩টি করে আসন পেয়েছে।
সরকার গড়তে ৭৬টি আসনের প্রয়োজন। তবে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পায়নি। সেক্ষেত্রে পিভিভি’র গির্ট ওয়াইল্ডার্স সমমনা দলগুলো নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে পারেন এবং সে সম্ভাবনাই প্রবল। এর মধ্যদিয়ে এতদিনের উদার গণতান্ত্রিক নেদারল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে কট্টর ও উগ্রপন্থি ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষীদের হাতে।
যেমনটা বলছে জনপ্রিয় ডাচ দৈনিক এনআরসি। গির্ট ওয়াইল্ডার্সের জয়ে প্রত্রিকাটির মন্তব্য, ‘কট্টর ডানপন্থি লোকরঞ্জনবাদীরা দ্য হেগ’র ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। উগ্রবাদীদের উত্থানে রুট যুগের অবসান ঘটছে।’ বিবিসি বলেছে, ‘এই ফলাফল ও কট্টর ডানপন্থি নেতা নাটকীয় জয়ে ডাচ রাজনীতির জন্য বড় এক ঝাঁকুনি। ইউরোপের জন্যও বড় ধাক্কা।’
গির্ট একাধারে অভিবাসনবিরোধী, ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী। ইউরোপজুড়ে যে উগ্রপন্থার উত্থান ঘটছে তারই অংশ হিসেবে গত কয়েক বছর ধরে ওয়াইল্ডার্সের উত্থান হয়েছে। অভিবাসী বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষদের জন্য সীমান্ত বন্ধ ও মুসলিমদের পবিত্র কোরআন নিষিদ্ধ করতে চান তিনি। সে কথা প্রকাশ্যেই বলে আসছেন ৬০ বছর বয়সি বিতর্কিত এই রাজনীতিক।
আর তাই ওয়াইল্ডার্সের এ জয় নেদারল্যান্ডসের মুসলিমরা এখন রীতিমতো ভীত ও আতঙ্কিত। মুসলিম অধিকার সংস্থা ‘কন্টাক্ট বডি ফর মুসলিম অ্যান্ড গভার্নমেন্ট’র নেতা মুহসিন কোকটাস বলেছেন, ‘ডাচ মুসলিমদের জন্য এ নির্বাচনের ফলাফল বেশ উদ্বেগজনক। আমরা কেউ ভাবিনি আইনের শাসনবিরোধী একটি দল এতটা বড় হবে।’
গির্ট ওয়াইল্ডার্স দীর্ঘ সময় ধরে নেদারল্যান্ডসে রাজনীতি করছেন। কিন্তু শুরু থেকেই তিনি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষেধাগার করে এসেছেন। ইসলামকে নিয়ে করেছেন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। আর এসবের কারণে ২০০৪ সাল থেকেই পুলিশি নিরাপত্তায় মধ্যে থাকতে হয়েছে তাকে।
২০১৬ সালে মরক্কোর নাগরিকদের সম্পর্কে বাজে ও আপত্তিকর মন্তব্য করে বৈষম্যের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। এমনকি ব্রিটিশ সরকার তাকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরাপ করে। কিন্তু এরপরও কখনও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি তিনি। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে তার দলের অঙ্গিকার ছিল মসজিদ, কোরআন ও নারীদের স্কার্ফ নিষিদ্ধ করা।
তবে জয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াইল্ডার্স বলেছেন, ‘আইন ও সংবিধানের মধ্যে থেকে’ তিনি তার নীতিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। তবে তার এই কথায় ভরসা পাচ্ছেন না মুসলিমরা। ডাচ মুসলিম নেতা মুহসিন কোকটাস বলছেন, ‘নেদারল্যান্ডসে ইসলাম ও মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত।’
এই মুসলিম নেতা আরও বলেছেন, নেদারল্যান্ডসে মুসলিমদের অধিকার রক্ষা এবং আইন ও শাসন অক্ষুন্ন রাখতে তাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নেদারল্যান্ডসের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যই এটি করতে হবে।
নেদারল্যান্ডসে বাস করেন মরক্কোর বংশোদ্ভূত অনেক মানুষ। তাদের একজন হলেন হাবিব এল কাদ্দুরি। তিনি ডাচ মরক্কানদের অধিকার রক্ষায় একটি সংস্থাও পরিচালনা করেন। হাবিব এল কাদ্দুরি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ওয়াইল্ডার্স মুসলিম ও মরক্কানদের সম্পর্কে (বিষেদাগারের জন্য) পরিচিত। আমাদের শঙ্কা সে আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখাবে।’