নতুন দিল্লি:মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে আবারও ঘনিবূঢ় কালো মেঘ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আগামী বুধবার শেষ হতে চলেছে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে তেহরানের পক্ষ থেকে যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে তারা ‘এখনও চূড়ান্ত আলোচনা থেকে অনেক দূরে” অবস্থান করছেন।
শনিবার একটি টেলিভিশন ভাষণে গালিবাফ বলেন, শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এখনও ‘অনেক বড় ফাঁক‘ রয়েছে এবং বেশ কিছু ‘মৌলিক বিষয়ে ‘মতবিরোধ কাটেনি। তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার এবং কূটনৈতিক মহল এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার প্রহর গুনছে।
গত ১১ই এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিদলের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং সাথে ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
যদিও এই বৈঠকটিকে একটি বিশাল অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল, কিন্তু গালিবাফের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে যে সেই আলোচনা কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ইরান কেবল তখনই সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল যখন ওয়াশিংটন তাদের প্রাথমিক কিছু শর্ত মেনে নিয়েছিল। গালিবাফের ভাষায়, আমরা রণক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েছি। আমরা যদি যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়ে থাকি, তবে তা এই কারণে যে তারা আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়েছিল।‘তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের জন্য এই আলোচনা হলো “সংগ্রামের একটি কৌশল মাত্র।
ইরান ও আমেরিকার এই দ্বৈরথের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক দিনে এই প্রণালীটি নিয়ে ইরানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল।
শনিবার ইরান ঘোষণা করে যে, হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ঠিক একদিন আগেই তারা এটি খুলে দেওয়ার কথা বলেছিল। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, এই জলপথ অতিক্রম করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে ‘শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা‘হিসেবে দেখা হবে এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
এর বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি ইরানকে‘ব্ল্যাকমেইল‘ করার চেষ্টা না করার জন্য সতর্ক করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) আবার প্রণালীটি বন্ধ করতে চেয়েছিল, যা তারা বছরের পর বছর ধরে করে আসছে। কিন্তু তারা আমাদের ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না।‘তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, যদি বুধবারের মধ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছানো না যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বোমা হামলা শুরু করতে দ্বিধা করবে না।
এই সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি গায়ে লেগেছে ভারতেরও। শনিবার হরমুজ প্রণালীতে ভারতের পতাকাবাহী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ‘জগ অর্ণব’এবং ‘সানমার হেরাল্ড’ এর ওপর ইরানি গানবোট থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ (VLCC)।
যদিও এই ঘটনায় কোনো হতাহত বা জাহাজের বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে ওমানের উত্তর-পূর্বে এই হামলার পর জাহাজ দুটিকে যাত্রা বাতিল করে ফিরে আসতে হয়। ভারত এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দিল্লির পক্ষ থেকে ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে ইরান ভারতীয় জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করলেও বর্তমানের এই গুলিবর্ষণের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বর্তমান এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর বিমান হামলা শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দুই সপ্তাহ আগে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খতিবজাদেহ জানিয়েছেন, পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। তারা আলোচনার চেয়ে প্রথমে একটি বোঝাপড়ার রূপরেখা তৈরির ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। যদিও সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল সোমবার ইসলামাবাদে আবারও আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তেহরানের পক্ষ থেকে তার কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব এখন বুধবারের দিকে তাকিয়ে আছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপ এবং সামরিক অভিযানের হুমকি, অন্যদিকে ইরানের হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের পাল্টা কৌশল। এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশেষ করে ভারতের মতো দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যদি শেষ মুহূর্তে কোনো নাটকীয় কূটনৈতিক সমঝোতা না হয়, তবে বুধবারের পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।