ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি পারস্য নববর্ষ (নওরোজ) উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে ২০২৬ সালকে “জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় নিরাপত্তার অধীনে প্রতিরোধমূলক অর্থনীতির বছর” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি সম্প্রতি তুরস্ক এবং ওমানে হওয়া ভয়াবহ হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।
সাবেক সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি, যিনি সম্প্রতি ইরানের নেতৃত্বের হাল ধরেছেন, তার নিজস্ব টেলিগ্রাম চ্যানেলে এই বার্তাটি প্রচার করেন। তার ভাষণে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
ইরান বর্তমানে এক কঠিন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মোজতবা খামেনির এই ‘প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি’র ডাক মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে চাঙ্গা করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা ছাড়া অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
গত কয়েক সপ্তাহে তুরস্ক এবং ওমানের ভূখণ্ডে বেশ কিছু বড় ধরনের হামলা সংঘটিত হয়েছে, যার পেছনে আঞ্চলিক শক্তিগুলো ইরান বা তাদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে আসছিল। তবে এই প্রথম সরাসরি মুখ খুললেন মোজতবা খামেনি।
বার্তায় তিনি দাবি করেন, ‘তুরস্ক এবং ওমানে হওয়া হামলাগুলোর সাথে ইরান বা ইরানের মিত্র বাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং ইরানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং তথাকথিত ‘ইরান যুদ্ধের’ আবহে তার এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যখন তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তির সাথে ইরানের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে, তখন এই অস্বীকারবাণী উত্তেজনা প্রশমনে কোনো ভূমিকা রাখে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
২০১৬ সাল থেকে মোজতবা খামেনিকে ইরানের ক্ষমতার অলিন্দে বেশ সক্রিয় দেখা গেলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তার সর্বোচ্চ নেতার আসনে আসীন হওয়া ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। রয়টার্সের ভাষ্যমতে, বাবার মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার প্রতিটি পদক্ষেপকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।
মোজতবা খামেনি যে সময়টিতে ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ কথা বলছেন, সেই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ওমান সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং তুরস্কের সীমান্তে অস্থিরতা ইরানকে সরাসরি বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যদিও তিনি দায় অস্বীকার করেছেন, কিন্তু পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগীরা ইরানের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’-এর দিকেই আঙুল তুলছে।
রয়টার্সের ‘ইরান ব্রিফিং’ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোজতবা খামেনির এই নববর্ষের ভাষণ মূলত দেশের ভেতরের মানুষকে শান্ত করার এবং বহির্বিশ্বকে একটি প্রতিরক্ষামূলক বার্তা দেওয়ার কৌশল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার এই ভাষণ দেশটিকে এক নতুন পথে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন, অন্যদিকে রয়েছে যুদ্ধের দামামা থেকে দেশকে রক্ষার চ্যালেঞ্জ। তবে তুরস্ক ও ওমানের ঘটনায় তার সাফাই বিশ্বদরবারে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে ইরানের বাস্তব সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।