বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন

একনজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পুরো বাজেট

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ৬ Time View

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই ঐতিহাসিক বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রস্তাবিত মেগা বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের এটিই প্রথম এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট।

নিচে মূল বাজেটের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের প্রধান অংশগুলো তথ্যগত মিল রেখে সম্পূর্ণ প্রমিত বাংলায়, ছোট ছোট প্যারাগ্রাফে ভিন্ন আঙ্গিকে সাজিয়ে দেওয়া হলো:

অনুচ্ছেদভিত্তিক সংক্ষেপ ও মূল বক্তব্য:

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন সরকারের যাত্রা

দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াই এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই মহান সংসদে নতুন সরকারের পক্ষে প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন।

শহিদ ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদ ও নির্যাতিত নারীদের বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মদানকারী সকল শহিদ এবং গুম, খুন ও গুলিবর্ষণের শিকার হওয়া আহত যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, যাদের আত্মত্যাগ দেশে অধিকারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

রাজনৈতিক সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী পথ ধরে বিএনপি বরাবরই জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলের ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফাই মূলত গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক জমিন তৈরি করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের এই ৩১ দফার পথ ধরে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে জুলাই জাতীয় সনদে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।

অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ ও মানবিক সমাজ

ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে এবং সমাজ-সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে, তা পুনরুদ্ধার করতে রাজনৈতিক সংস্কার অপরিহার্য। তবে এই রাজনৈতিক সংস্কারকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি। এর অর্থ হলো, দেশের সব মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনা সম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

অতীতের গৌরব ও ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে উত্তরণ

১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে দেশের মূল অর্থনৈতিক সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে লাগামহীন লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির মৌল ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে। বর্তমান সরকার জনগণের ভরসায় সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই নতুন উত্তরণের দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।

বাজেট কেবল হিসাব নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথ-নকশা

বর্তমান সরকারের কাছে জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের এক বছরের প্রথাগত আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ নয়। এটিকে দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়নের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় পথ-নকশা হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই বাজেট হবে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন।

নির্বাচনী ইশতেহার ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের মাধ্যমে একটি মানবিক কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। তবে এই যাত্রার শুরুতেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি মোকাবিলা করতেই এবারের বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে মূল সামষ্টিক কৌশল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য

সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। এর পাশাপাশি দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এই লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

বাজেটের ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার খাত: 

১. সবার জন্য উন্নয়ন: দেশের সব অঞ্চলের, সর্বস্তরের এবং সর্বশ্রেণির মানুষের সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

২. মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে বাস্তবমুখী ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হবে এবং সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

৩.সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করতে দেশের সকল স্তরের ও সকল বয়সের নাগরিকদের জন্য সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে।

৪. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। কৃষিকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৫. ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সরকারি কাজের দীর্ঘসূত্রতা, বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।

৬. আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে পূর্ণ শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সংস্কার করা হবে।

৭. জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা: দেশের উৎপাদনশীল খাতের চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সাথে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

৮. তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ: দেশের প্রযুক্তি খাতকে একটি গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা হবে।

৯. পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বনায়নকে সবুজ বিপ্লবে রূপ দেওয়া হবে। নদীসমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা হবে।

১০. দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা: রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে, যাতে সরকারি বিনিয়োগের শতভাগ কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।

নতুন অর্থনৈতিক খাত ও বিনিয়োগের নীতিগত বিবেচনা

প্রথাগত খাতের বাইরে এতদিন মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, স্পোর্টস বা ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেটের প্রতিটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি নীতিগতভাবে কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে।

বর্তমান সরকার দেশের মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী লুটেরা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের ভিত রচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই বাজেটে তার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোকেই প্রতিফলিত করা হয়েছে। সরকার আত্মবিশ্বাসী, এই মেগা বাজেট দেশের উন্নয়নকে বৈষম্যহীন করতে এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সব শ্রেণির নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের সফল নীতি-পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category