ইউক্রেনীয় রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে রুশ ড্রোন হামলায় একটি ট্রেনের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই ট্রেনে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক ডেভিড পেট্রিয়াসসহ ইউরোপের কয়েকজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন বলে দাবি করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ। হামলার সময় তারা সীমান্ত পার হয়ে যাওয়ায় অল্পের জন্য রক্ষা পান বলে জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এ ঘটনাকে ‘পুতিনের সন্ত্রাস যা সরাসরি ইইউ এবং ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, পশ্চিম ইউক্রেনে চালানো এই হামলা শুধু দেশটির অবকাঠামোর ওপর আঘাত নয়, এর প্রভাব ইউরোপের নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রাতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা চালানো হয়। এতে সাড়ে চার শতাধিক রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত এবং ৪০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী জানিয়েছে, তারা ৪০৫টি ড্রোন ও চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস বা ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধের প্রধান কেন্দ্র কিয়েভ ও পূর্বাঞ্চলের তুলনায় পশ্চিম ইউক্রেন সাধারণত অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হলেও এবারের হামলায় ওই অঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি হামলার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশটিতেও বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। ইউক্রেনীয় ও পোলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দোরোহুস্ক-ইয়াহোদিন সীমান্ত ক্রসিং থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে একটি লরিতেও হামলা হয়েছে।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করা ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রতিষ্ঠান ‘ডেইলি হিউম্যানিটি’র পরিচালক ক্যাটেরিনা সেরগাতস্কেভা ওই সময় ওয়ারশগামী ট্রেনে ছিলেন। তিনি জানান, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে পৌঁছানোর পর সকাল ৯টার দিকে যাত্রীদের দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে মাঝরাতেও প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেনের বাইরে অবস্থান করতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, এ যাত্রায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, আমাদের খুব দ্রুত সরতে বলা হয়েছিল। এরপর আমি প্রথম ড্রোনের শব্দ শুনতে পাই। সীমান্তে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক শ গজ আগে ‘শাহেদ’ ড্রোন দেখা ও শোনা অত্যন্ত ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল বলে জানান তিনি। তবে ওই ট্রেনে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কিয়েভ থেকে পোল্যান্ডের চেলমগামী রাতের ট্রেনে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদও হামলার সময় সেখানে ছিলেন। তিনি জানান, তারা সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১০ ঘণ্টা অবস্থান করেন এবং তিন দফায় তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, তৃতীয় দফায় সরিয়ে নেওয়ার সময় একটি ক্ষেপণাস্ত্র ট্রেনের সামনের লোকোমোটিভে আঘাত হানে এবং ইঞ্জিনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে যাত্রীরা দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে লেকের পাশের ঝোপঝাড়ের আড়ালে আশ্রয় নেন বলেও জানান তিনি।
ইউক্রেনীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই ট্রেনে ইউরোপের কয়েকটি দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছাড়াও বরিস জনসন ও ডেভিড পেট্রিয়াসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছিলেন। হামলার মাত্র কিছুক্ষণ আগে তারা সীমান্ত অতিক্রম করেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, রুশ হামলার আশঙ্কার কারণে ট্রেন চলাচলের সময়সূচি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছিল। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই একটি কূটনৈতিক ট্রেন ডিপো থেকে রওনা হয়েছিল। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, পশ্চিম ইউক্রেনের ওই রেলপথে হামলার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে ট্রেনটি।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বরিস জনসন বলেন, আজ সকালে পোল্যান্ড সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ইউক্রেনীয় লোকোমোটিভ উড়িয়ে দিতে পুতিনকে কোন বিকৃত যুক্তি চালিত করেছে তা আমি জানি না। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রতিদিন বেসামরিক রেলওয়েতেও ইউক্রেনীয়রা এই ধরনের নির্বিচার ও অর্থহীন হামলার শিকার হচ্ছে।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কে তিনজন এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় মাইকোলাইভে ৭১ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হামলার পর ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহা বলেন, এটি কেবল ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় সীমানায় হামলা নয়, বরং ন্যাটোর দরজায় পুতিনের সন্ত্রাসের কড়া নাড়া।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, যুদ্ধ যাতে ইউরোপের অন্য অংশে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিন নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখে লড়াই করে যাচ্ছে।
এদিকে রুশ ড্রোন হামলার পর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জরুরি বৈঠক করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে রুশ হামলা আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব পোল্যান্ডের ভূখণ্ডেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পোলিশ নিরাপত্তা সংস্থা ও মিত্র দেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলার আশঙ্কা আগে থেকেই করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রদোস্লাভ সিকোরস্কি এ ঘটনায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসী নীতির সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইউরোপ থেকে আসা সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত পশ্চিম ইউক্রেনের রেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। তবে ট্রেনে থাকা বরিস জনসন বা অন্য কোনো বিদেশি ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগের বিষয়ে মস্কো আলাদা কোনো বক্তব্য দেয়নি।
দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা বাড়িয়েছে। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে ডিজেল জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব হামলার কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে লিথুয়ানিয়ায় ড্রোন দেখা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভিলনিয়াস বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি ড্রোন নয়, পাখি ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেলে বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। ওই ঘটনায় ন্যাটোর যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হয়েছিল।