দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে আজ শনিবার সারাদেশে শুরু হচ্ছে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ কর্মসূচি।
ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। সব মিলিয়ে ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকাদান নয়, আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও জরুরি।
শুক্রবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ রাজধানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতও উপস্থিত থাকবেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৪ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির মাধ্যমে টিকা দেওয়া হবে। এসব শিশু গত ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হাম-রুবেলা টিকাদানের মূল ক্যাম্পেইনে টিকা পায়নি। টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে স্বাস্থ্য বিভাগের ভুলের বিষয়টিও এর আগে উঠে এসেছিল।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. হালিমা বলেন, ৯ থেকে ১৫ মাসে যে দুটি টিকা আমরা যেটিকে এমআর ভ্যাকসিন বলি, অবশ্যই সেটা নিতে হবে। যথারীতি, সরকারের ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী টিকা নেবে এবং অতিরিক্ত ডোজটিও নিয়ে রাখবে। মা-বাবাদের বলতে চাই, আপনারা আপনাদের বাচ্চাদের অবশ্যই টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসবেন এবং হাম-রুবেলার যে ভ্যাকসিনটা, অবশ্যই আপনারা সবাই দেবেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলেন, যেটা শুরু হবে, এটাকে বলে মপআপ প্রোগ্রাম। মপআপ মানে হচ্ছে, যারা বাদ পড়ে গিয়েছে, বা যারা জানত না, বা কোনো কারণে তাদের লজিস্টিক প্রবলেমে আসতে পারেনি, তাদেরকে ক্যাচ করা। সুতরাং, এটাও একটা বিরাট ফ্যাক্টর।
এর আগে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারাদেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ওই কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এর আগে মার্চের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। প্রায় সাত মাস পার হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
সাত মাসের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর হামের সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮৩ জন এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার পর ১০১ জন মারা গেছেন। একই সময়ে সারাদেশে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ১৫ জনের। গতকালও সারাদেশে পাঁচ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রধান উপায় টিকা। আমরা ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনতে চাই। ইপিআইয়ের মাধ্যমে নিয়মিত টিকাদান চলবে, পাশাপাশি ক্যাম্পেইনও চলবে।’
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করে পরিস্থিতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রাদুর্ভাবের আগের বছর দেশে হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ছিল না এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২ জন। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।