চলমান সংঘাতের অবসানে আলোচনার জন্য কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাতটি শর্ত দিয়েছে ইরান। এসব শর্ত মেনে না নিলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের’ মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাই জানিয়েছেন, কাতারের মাধ্যমে তেহরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ইরান।
শর্তগুলোর বিষয়ে রেজাই বলেন, ‘আমাদের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা অর্থ ছেড়ে দেওয়া এবং নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আলোচনা শুরুর জন্য ইরান সাতটি শর্ত নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রেজাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের তৈরি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে চায় এবং আরও বড় বিপদের মুখে পড়া এড়াতে চায়, তাহলে ইরানের অধিকার ও শর্তগুলো মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই আরও বলেন, ‘এই শর্তগুলো মেনে নেওয়াই ওয়াশিংটনের স্বার্থে ভালো হবে। ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো কাজ হবে না, আমরা যে কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য শতভাগ প্রস্তুত।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে কাতার ও পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে দেশ দুটি।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে ভয়াবহ সংঘাতের সূত্রপাত হয়, তা বন্ধে আঞ্চলিক অন্যান্য দেশও কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানি সামরিক বাহিনীর মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন করে বিমান হামলার আশঙ্কা এখনো রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেহরান প্রস্তুত রয়েছে। আগের দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশটির সামরিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের এই সচিব জানান, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও আরব সাগরজুড়ে থাকা মার্কিন নৌঘাঁটি এবং যুদ্ধজাহাজগুলোকে কেন্দ্র করে ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশল সাজানো হয়েছে।
এ ছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ বা বিমানবাহী রণতরীর কাছে একাধিক ওয়ারহেডযুক্ত জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন রেজাই।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে এর জবাব হবে ব্যাপক ও ভয়াবহ। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি দেশটির বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত মার্কিন কোম্পানিগুলোও ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে রেজাই বলেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে যুদ্ধ এখনো চলছে।’ তবে যত দ্রুত সম্ভব সংঘাতের অবসান ঘটাতে তেহরান কৌশলগতভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে রেজাই বলেন, পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে আসার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি তেহরান। তবে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ ইরানকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা বা ফতোয়ার বিধান এখনো মেনে চলছে দেশটি।