ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আবারও ভয়াবহ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। শনিবার ভোরের এই সিরিজ হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত এবং ৪ শিশুসহ আরও ২৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। রাশিয়ার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এই ধরনের প্রাণঘাতী হামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, ভোরে অন্তত এক ডজনেরও বেশি শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো রাজধানী কেঁপে ওঠে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে শেভচেনকিভস্কি জেলার একটি আবাসিক ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলা ধ্বংস হয়ে আগুন ধরে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক বাসিন্দা আটকে পড়েন, যাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি উদ্ধারকারী দল একযোগে কাজ করছে। একই সঙ্গে শহরের বেশ কিছু গুদামঘরে আগুন ধরে যায় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
চলতি সপ্তাহেই কিয়েভে এটি দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এর মাত্র দুই দিন আগে, গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে রাশিয়ার চালানো ব্যাপক আক্রমণের সময় একটি সন্দেহভাজন রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিবেশী পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে গিয়ে পড়ে, যা নিয়ে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র পোল্যান্ড তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বৃহস্পতিবারের সেই হামলায় ক্রিভি রিহ অঞ্চলের একটি গ্রামেই একই পরিবারের ছয়জনসহ মোট ৯ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি ও সাধারণ পরিকাঠামো ধ্বংস করতে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, আকাশসীমা সুরক্ষায় ব্যবহৃত মার্কিন প্রযুক্তির ‘পেট্রিয়ট’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকটে পড়েছে ইউক্রেন।
রুশ আক্রমণের জবাবে ইউক্রেনীয় বাহিনীও রাশিয়ার অভ্যন্তরে ও দখলকৃত অঞ্চলে হামলা জোরদার করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে আঘাত হানতে ইউক্রেন তাদের দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে একের পর এক রুশ তেল শোধনাগার, ডিপো ও রফতানি টার্মিনালকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইউক্রেনের এই পাল্টা আক্রমণে সম্প্রতি দানিপ্রোপেত্রোভস্ক এবং ওডেসা বন্দরের কাছে থাকা একটি পণ্যবাহী জাহাজেও সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তার আকুতি জানিয়ে আসছেন। বিশেষ করে ইউক্রেন যাতে তাদের নিজ দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘পেট্রিয়ট’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি করতে পারে, সে জন্য ওয়াশিংটনের কাছে লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প এই লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি প্রকাশ করেছিলেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানান যে, ওয়াশিংটন এখনও এই প্রস্তাবে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, কারও হাতে এই ধরনের সংবেদনশীল প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে অত্যন্ত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও সতর্ক হতে হবে। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি সত্য, তবে এমন উন্নত প্রযুক্তি অন্য কোনো দেশকে দিয়ে দেওয়া খুবই কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। আমি বলছি না যে এমনটি ঘটবে, তবে যাদের হাতে আজ আপনি প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে কোনো একদিন তারা আপনার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ইউক্রেনের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খেল।
যুদ্ধ চার বছরে পা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও রণক্ষেত্রে নতুন নানা সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এক দিকে যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে ইউক্রেনীয় সেনারা চরম চাপে রয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের রাজনীতিতেও ইউক্রেন যুদ্ধ কেন্দ্রিক নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি প্রখ্যাত মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ট্রাম্প সমর্থক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব লরা লুমার ইউক্রেন যুদ্ধের সমর্থনে তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে সম্ভাব্য কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা-রাশিয়ার জ্বালানি রফতানির ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের জন্য মার্কিন সিনেটে একটি নতুন বিল আনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কিয়েভে অব্যাহত রুশ হামলা এবং মার্কিন প্রশাসনের সমরাস্ত্র সরবরাহে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ইউক্রেন সংকটকে এক জটিল ও নতুন অনিশ্চিত মোড়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।