মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এখন নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সামরিক মজুত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনে চীনের সহায়তার দিকে ঝুঁকছে তেহরান। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্ক নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সামরিক শক্তিই নয়, কূটনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল- তিন পক্ষই এখন নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ দিনের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, এ অভিযানে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এ সময় হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয় এবং ইরানের ছোড়া ১ হাজার ৭০০টির বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষা শিল্পকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ব্যবহৃত অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ৮৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র। একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
গবেষকদের মতে, অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই দ্রুত আগের মজুত অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ভবিষ্যতে তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়া বা অন্য কোনো বড় ধরনের সংঘাত দেখা দিলে সীমিত অস্ত্র মজুত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার দিকে নজর দিয়েছে ইরান।
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ৬ থেকে ৭ কোটি মার্কিন ডলারের একটি চুক্তির আওতায় ইরান ৩০০ থেকে ৪০০টি ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনার পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে চীনের তৈরি কিউডব্লিও-১২ ও এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হংকংভিত্তিক ঝংশিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই চুক্তির বিষয়টি এগিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইরান ও চীনা সরবরাহকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহের খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে। তাদের দাবি, চীন সবসময় শান্তি ও সংঘাত নিরসনের পক্ষে কাজ করে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। এর পর থেকে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্রুত স্থান পরিবর্তন করা যায়- এমন অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে তেহরান।
সূত্র অনুযায়ী, সম্ভাব্য অস্ত্রের প্রথম চালান পশ্চিম চীনের উরুমচি থেকে আকাশপথে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পাকিস্তান হয়ে তা ইরানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে পাকিস্তান অংশে এসব সরঞ্জাম কীভাবে পরিবহন করা হবে, তা নিশ্চিত নয়।
এদিকে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) চীন থেকে ইরানে বিমান প্রতিরক্ষা অস্ত্র সরবরাহে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ম্যানপ্যাডস ছোট দল সহজে পরিচালনা করতে পারে এবং দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো যায়। ফলে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় এগুলো শত্রুপক্ষের হামলায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।
কিউডব্লিও-১২ সর্বাধুনিক সংস্করণের না হলেও ড্রোন ও নিচু উচ্চতায় উড়তে থাকা যুদ্ধবিমান মোকাবিলায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। দেশটির কৃষি, উৎপাদনশিল্প, সীমান্ত বাণিজ্য এবং বিকল্প তেল রপ্তানি ব্যবস্থার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রয়েছে।
তবে এর বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। মাংস, ডিম, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ইরান সংঘাতের প্রভাব পড়ছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানেও। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আগের মতো দৃঢ় নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা, সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ইরান যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুকে ঘিরে প্রশ্ন বাড়ছে।
আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির মামলার বিচারও চলছে তার বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করতে হচ্ছে, ইরান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ইসরায়েলে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।