পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীজুড়ে কোরবানির পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে এবার রাজধানীর ২৮টি নির্ধারিত স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গরু, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে ঢাকামুখী হয়েছেন খামারিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরবাসীর সুবিধা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে রেখে পরিকল্পিতভাবে হাট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি হাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসারণ, পশু চিকিৎসাসেবা এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সিটি করপোরেশন। পাশাপাশি জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলও থাকবে।
খামারিরা বলছেন, কয়েক মাস ধরেই কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও ভালো দামের প্রত্যাশা করছেন তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, দেশীয় খামারে পর্যাপ্ত পশু থাকায় এবার বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।
বরিশালের খামারি সাইফুল বলেন, আমার খামারে সাতটি গরু আছে। কোরবানির কয়েক দিন আগে গরুগুলো ঢাকায় এনে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছি। এখন শেষ সময়ের যত্ন চলছে।
রাজধানীর নির্ধারিত ২৮টি স্থানে বড় আকারের পশুর হাট বসানো হবে। এসব এলাকায় ক্রেতাদের ভিড় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে হাটের অবকাঠামো নির্মাণ, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এবার পশুর হাটে ভোগান্তি কম হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সম্ভব হলে পরিবেশ দূষণও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আসাদ খান বলেন, প্রতি বছর গ্রামে গিয়ে কোরবানি দিই। তবে এবার ঢাকাতেই কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা আছে। এখনো বাজার ও পশুর দাম সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে এখন থেকেই বাড়ছে ব্যস্ততা। খামারি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের উপস্থিতিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জমে উঠবে কোরবানির বাজার।
এদিকে পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা কোনো ধরনের গোপন প্রক্রিয়ায় হাট ইজারা দিচ্ছি না। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সবকিছু সম্পন্ন হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি প্রক্রিয়া দেখতে পারছেন এবং আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে। সবাইকে সুযোগ দিতে তিন ধাপে দরপত্র কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এবার ১২টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। ইতোমধ্যে হাটের ইজারা ও সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, সব কার্যক্রম উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগে কোথাও হাট বসতে দেওয়া হবে না। সীমানার বাইরে হাট পরিচালনা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে ১০টির ইজারা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি পাঁচটির কার্যক্রমও আগামী ১১ মে’র মধ্যে চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু প্রস্তুত ও বাড়তি পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন দেশের খামারিরা। গ্রাম থেকে শহর-সবখানেই ছোট-বড় খামারের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অসংখ্য খামার। ফলে কোরবানির পশুর জন্য বাইরের ওপর নির্ভরতা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এ বছর প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন খামারিরা। ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু বাজারজাত করার চেষ্টা চলছে। এজন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার, ঘাস, খড়-ভুষি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বরিশালের খামারি শাহাবুদ্দিন জানান, কয়েক মাস আগ থেকেই পরিকল্পিতভাবে পশুর খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করেছেন তারা। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে। তবে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। তাই বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়াটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
নারী উদ্যোক্তা হাসিনা বেগম বলেন, বড় গরুর পাশাপাশি মাঝারি আকারের গরু ও ছাগল পালন করছেন তিনি। কারণ এসব পশুর চাহিদা তুলনামূলক বেশি। এতে ঝুঁকি কম থাকে এবং বিক্রির সম্ভাবনাও বাড়ে।
খামারি অলিউর রহমান জানান, করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গবাদিপশুর দানাদার খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এখনো সেই বাড়তি দামেই খাদ্য কিনে পশু পালন করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও লাভ কমে গেছে। লোকসানের কারণে অনেক খামারি গরু পালন ছেড়ে দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
তবে নানা সংকটের মধ্যেও আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে খামারিদের মধ্যে রয়েছে আশাবাদ। সঠিক দাম পাওয়া গেলে লোকসান কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে মনে করছেন তারা।