বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ অপরাহ্ন
Title :
১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমলো ৩৫৭ টাকা প্রাথমিকে কাটছে প্রধান শিক্ষক সংকট খামেনির শেষবিদায় অনুষ্ঠানে হামলার শঙ্কা, তেহরানের হুঁশিয়ারি আমরা ফিলিস্তিনকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসি: রাষ্ট্রদূতকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু বাংলাদেশের অভ‍্যন্তরীণ ইস্যুতে চীন কারো হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না: রাষ্ট্রদূত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী আর্জেন্টিনাকে টপকে ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে ফ্রান্স গরু জবাইয়ে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে থালাপতির সরকার ঢাকা ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক ও নৌপথের অগ্রগতির বিষয়ে জানলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রাথমিকে কাটছে প্রধান শিক্ষক সংকট

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ১ Time View

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রধান শিক্ষক নিয়োগের আইনি জটিলতার অবসান ঘটেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি যুগান্তকারী রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩৬ হাজারেরও বেশি শূন্য পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এই রায়ের ফলে যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটবে, তেমনি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিশাল নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে চলমান সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৭ সালে। তৎকালীন সময়ে সরকার কর্তৃক জাতীয়করণকৃত বা অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই রিটে ‘অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি) বিধিমালা’র জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি সংক্রান্ত ৯(১) বিধির একটি বিশেষ অংশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।

রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট একটি রায় দেন। রায়ে সংশ্লিষ্ট বিধির ওই অংশটিকে বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করা হয়।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) মঞ্জুর করা হয়। একই সাথে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতাও স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপক্ষ নিয়মিত আপিল দায়ের করে। পাশাপাশি সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরাও এই আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের করা সেই আপিল মঞ্জুর করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। এই রায়ের ফলে বেসরকারি ও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা কেটে যায় এবং সরকারের জন্য প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, আদালতের রায়টি আসার পরপরই মন্ত্রণালয় কর্মতৎপরতা শুরু করেছে। আইনগত বাধা দূর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের শিক্ষা খাতের এই বড় শূন্যতা পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল ফোন করে আদালতের রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করার পরপরই আমি পিএসসির (সরকারি কর্মকমিশন) চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পিএসসি চেয়ারম্যান আমাদের দ্রুত শূন্য পদের চাহিদা বা রিকুইজিশন পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চাহিদা পিএসসিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি বর্তমানে দশম গ্রেডের (২য় শ্রেণী) অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, এই পদের কোনো ফাইল বা নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে পিএসসির সুপারিশ অপরিহার্য। বর্তমান নিয়োগবিধি অনুসরণ করে মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ,পূরণ করা হবে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দিয়ে। বাকি ২০ শতাংশ, পদে সরাসরি নতুন প্রার্থী নিয়োগ দেওয়া হবে।

প্রধান শিক্ষক পদে এই বিশাল পদোন্নতি প্রক্রিয়ার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজারেরও বেশি। এই বিদ্যালয়গুলোতে স্বাভাবিক নিয়মেই সহকারী শিক্ষকের প্রায় ২ হাজার ২০০টি পদ শূন্য রয়েছে।

এখন উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে যদি ৩৬,২৩৫ জন,সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়, তবে তাদের আগের পদগুলো স্বাভাবিকভাবেই খালি হয়ে যাবে। এর ফলে সহকারী শিক্ষকের মোট শূন্য পদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৮,৪৩৩টি।

বর্তমানে প্রধান শিক্ষক পদের শূন্য পদ রয়েছে ৩৬ হাজার ২৩৫টি। পদোন্নতিজনিত কারণে এ পদে নতুন করে আর কোনো অতিরিক্ত শূন্য পদ সৃষ্টি হবে না। ফলে প্রধান শিক্ষক পদের মোট সম্ভাব্য শূন্য পদও থাকবে ৩৬ হাজার ২৩৫টি।

অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষক পদের বর্তমান শূন্য পদ রয়েছে ২ হাজার ২০০টি। তবে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির কারণে আরও ৩৬ হাজার ২৩৫টি নতুন শূন্য পদ সৃষ্টি হবে। ফলে সহকারী শিক্ষক পদের মোট সম্ভাব্য শূন্য পদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৮ হাজার ৪৩৩টি।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এটি দেশের বেকার যুবসমাজ এবং প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক খবর। ৩৬ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণের পরপরই শূন্য হওয়া ৩৮ হাজারেরও বেশি সহকারী শিক্ষক পদে দ্রুত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এতে করে প্রাথমিকে শিক্ষক সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিকে এই বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে সরকার কাজ করছে এবং আগামী ২০২৮ সাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম, চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শুধু প্রাথমিকই নয়, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতেও বেশ কিছু শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পিএসসি-র মাধ্যমে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় বা বিশেষ নিয়োগ ড্রাইভের মাধ্যমে এসব শূন্য পদও দ্রুত পূরণ করার জন্য মন্ত্রণালয় তাগিদ দিচ্ছে।

আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষামন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনি কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস।

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আইনি জটিলতার কারণে হাজার হাজার শিক্ষক তাদের প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন, যার প্রভাব পড়ছিল বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও পাঠদান কার্যক্রমে। এই রায়ের ফলে শিক্ষকদের মনে যেমন স্বস্তি ফিরবে, তেমনি মাঠপর্যায়ের স্কুলগুলোর তদারকি আরও জোরদার হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস আদালতের রায়ের আইনি দিক ব্যাখ্যা করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ প্রথম থেকেই মেধা ও জ্যেষ্ঠতার সঠিক মূল্যায়নের পক্ষে আইনি লড়াই লড়েছে। আপিল বিভাগের এই রায়ের মাধ্যমে আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলেন শিক্ষকেরা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ৩৬ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ চালাতে হচ্ছিল। এতে একদিকে যেমন সহকারী শিক্ষকেরা অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে পিষ্ট হচ্ছিলেন, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলায় ঘাটতি দেখা দিচ্ছিল।

২০২৬ সালের ২ জুলাইয়ের এই আদালতের রায় এবং মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে। দ্রুততম সময়ে পিএসসি এই নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে দেশের ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category