ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটের আগে প্রচার অভিযান শেষ করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থি সেনেটর ফ্ল্যাভিও বলসোনারো।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববারের প্রথম ধাপের ভোটেই জয় পাওয়ার বিষয়ে দুজনই আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে সর্বশেষ জনমত জরিপে তাদের মধ্যে ব্যবধান কমে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
শনিবার দেশটির অর্থনৈতিক কেন্দ্র সাও পাওলোতে বিশাল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে প্রচার শেষ করেন ৮০ বছর বয়সী বামপন্থি নেতা লুলা। তার প্রচার শিবিরের দাবি, এবারের নির্বাচনের শেষ দিনের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় জমায়েত।
সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে লুলা বলেন, “আগামীকাল (রোববার) আমরা প্রথম ধাপেই নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছি।”
রোববারের নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্র ও বর্বরতার মধ্যে লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করে চরম ডানপন্থি শিবিরকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
একই সঙ্গে নির্বাচনকে ‘ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করে ওয়াশিংটনের ‘হস্তক্ষেপের’ বিষয়ে সতর্ক করেন লুলা।
অন্যদিকে ৪৫ বছর বয়সী ফ্ল্যাভিও বলসোনারো তার বাবা ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর প্রচার কৌশল অনুসরণ করে সাও পাওলো রাজ্যে বিশাল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। পরে রিও দে জেনেইরোতে জনসভা করেন তিনি।
ফ্ল্যাভিও বলেন, “আমি নিশ্চিত যে প্রথম ধাপেই এই নির্বাচনে আমাদের জয়লাভের সব পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে।”
ফ্ল্যাভিওর বাবা জাইর বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।
৭১ বছর বয়সী সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হন। পরে ফলাফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন তিনি। প্রচারাভিযানে বাবার একটি ছবি উঁচিয়ে ধরেন ফ্ল্যাভিও।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্ল্যাভিও বলসোনারোকে সমর্থন না দিলেও জানিয়েছেন, তিনি অত্যন্ত ‘সূক্ষ্মভাবে’ ব্রাজিলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন।
ওয়াশিংটনের এই ‘মাত্রাতিরিক্ত’ আগ্রহকে কেন্দ্র করে ব্রাজিলের নির্বাচনি ময়দানে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। লুলার সমর্থকরা এটিকে ব্রাজিলের নির্বাচনে ওয়াশিংটনের সরাসরি হস্তক্ষেপের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে ক্ষুব্ধ বলসোনারোর সমর্থকদের অনেকে বলছেন, দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে মার্কিন চাপ এলে তারা সেটিকে স্বাগত জানাবেন।
শনিবার প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, লুলা এগিয়ে থাকলেও ফ্ল্যাভিওর সঙ্গে তার ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে। রোববারের প্রথম ধাপের ভোটে কোনো প্রার্থীরই এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় ধাপের ভোট বা রান-অফ হতে পারে। সেখানে দুই প্রার্থীর মুখোমুখি লড়াই হবে।
২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবারের লড়াই আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ওই নির্বাচনে লুলা জাইর বলসোনারোকে দুই শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন।
নির্বাচনি প্রচারের শেষ মুহূর্তে বলসোনারো শিবির সিনেমা তহবিল নিয়ে একটি কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছে। সিনিয়র বলসোনারোর জীবনী নিয়ে নির্মাণাধীন ‘ডার্ক হর্স’ চলচ্চিত্রের অর্থায়নের বিষয়ে তদন্তের মুখে রয়েছেন ফ্ল্যাভিও।
দেশটির বড় একটি আর্থিক কেলেঙ্কেলায় অভিযুক্ত হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকা এক ব্যাংকারের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটির তহবিল সংগ্রহের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া লুলার বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে গত এপ্রিলে ফ্ল্যাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমতি দেয় ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট।
নির্বাচিত হলে কারাবন্দি বাবাকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফ্ল্যাভিও। একই সঙ্গে বাবার মতো তিনিও ব্রাজিলের ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে পরাজিত হলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান বা চ্যালেঞ্জ করার আগাম ভিত্তি তৈরি করতেই এমন মন্তব্য করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি রোববার ব্রাজিলের প্রায় ১৬ কোটি নিবন্ধিত ভোটার আইনপ্রণেতা, রাজ্য গভর্নর ও সেনেটর নির্বাচনের জন্যও ভোট দেবেন।
লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডানপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের উত্থানের প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের এই নির্বাচনের দিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরও নজর রয়েছে।