মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় যখন আঞ্চলিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, তখন মিসর সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার রাজধানী কায়রোতে তাঁকে স্বাগত জানান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে নতুন করে ভাবনা শুরু হওয়ার সময় শির এই সফর কায়রো ও বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনেছে।
মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, কায়রোর আল-ইত্তিহাদিয়া প্রাসাদে শি জিনপিংকে সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। গত এক দশকের মধ্যে এটিই চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম মিসর সফর।
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা তীব্র অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শি জিনপিংয়ের মিসর সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার মিসর
মিসর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে দেশটি বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে। তবে একই সময়ে কায়রো চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছে।
২০১৪ সালে সিসির চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্বের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
মিসরের সাবেক কূটনীতিক আইমান জায়নেলদিন বলেন, মিত্রতার পরিধি বাড়ানোর মিসরের চেষ্টা এবং এশিয়ার বাইরে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে চীনের আগ্রহ, দুই দেশের লক্ষ্য এখন একই জায়গায় এসে মিলেছে।
তিনি বলেন, চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে চায় মিসর। ফলে দুই দেশের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ক্রমেই সামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।
শিকে ঘিরে কায়রোয় ব্যাপক আয়োজন
চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই কায়রোতে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক চীনের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের সাজসজ্জায় মিসরের স্ফিংক্স ও চীনের মহাপ্রাচীরের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি তুলে ধরা হয়েছে।
মিসরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে চীন ও মিসরের পারস্পরিক ইতিবাচক সম্পর্ক তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রচার করা হচ্ছে।
সামরিক সহযোগিতায়ও ঘনিষ্ঠতা
দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার বড় উদাহরণ দেখা গেছে গত মাসে অনুষ্ঠিত যৌথ সামরিক মহড়ায়। ‘ইগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামের ওই মহড়ায় চীনের তৈরি জে-১৬ যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফালে যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। দুই দেশের বিমানবাহিনীর এমন যৌথ মহড়াকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছে।
চীনের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মিসর
মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়াতে আগ্রহী চীন। অন্যদিকে মিসরের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক প্রভাব এবং কূটনৈতিক গুরুত্ব দেশটিকে বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।
সুয়েজ খালের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিসরের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। একই সঙ্গে ১১ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশটি চীনা পণ্য ও বিনিয়োগের জন্য বড় বাজার।
মিসরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীন থেকে দেশটির আমদানির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি ১৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, বেইজিংয়ের কাছে মিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। দেশটির বড় অভ্যন্তরীণ বাজার বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয়। একই সঙ্গে আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের পথ এবং ফিলিস্তিন সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মিসরের কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
বিভিন্ন খাতে চীনের বড় বিনিয়োগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিসরে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। কনটেইনার বন্দর, সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্প, লোহার পাইপ, গাড়ির টায়ার ও উপগ্রহ তৈরিসহ নানা খাতে চীনা বিনিয়োগ রয়েছে।
এ ছাড়া কায়রোর পূর্বদিকে প্রেসিডেন্ট সিসির অন্যতম বড় প্রকল্প নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর ব্যবসায়িক এলাকা নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের দ্রুত বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে।