টানা কয়েক মাস ধরে সাধারণ মানুষের পকেটে যে চাপ তৈরি করেছিল রান্নার গ্যাসের খরচ, তাতে অবশেষে বড় ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ার সুযোগ তৈরি হলো। বিশ্ববাজারের নিম্নমুখী প্রবণতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে আনা হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এবার কমেছে এক লপ্তে ৩৫৭ টাকা।
বৃহস্পতিবার বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন মূল্য তালিকা ঘোষণা করা হয়। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই দেশজুড়ে এই নতুন দর কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তাদের সুবিধার্থে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত এলপিজির নতুন ও আগের দামের তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৮৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রতি সিলিন্ডারে দাম কমেছে ৩৫৭ টাকা।
এছাড়া প্রতি কেজি এলপিজির ভিত্তিমূল্য ১৫৭ টাকা ৬ পয়সা থেকে কমিয়ে ১২৭ টাকা ৩০ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম কমেছে ২৯ টাকা ৭৬ পয়সা।
অন্যদিকে, সরকারি খাতের সাড়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য আগের মতোই ৮২৫ টাকা রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো মূল্য পরিবর্তন হয়নি।
যানবাহনে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের দামও কমানো হয়েছে। প্রতি লিটারের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা ৪০ পয়সা, যা আগে ছিল ৮৬ টাকা ৯৩ পয়সা। ফলে প্রতি লিটারে দাম কমেছে ১৬ টাকা ৫৩ পয়সা।
মূল্য হ্রাসের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা। বিইআরসি সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছিল, তা সম্প্রতি শান্ত হতে শুরু করেছে। যুদ্ধ থামার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলপিজির কাঁচামালের দামও দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশে এলপিজি তৈরির মূল দুটি উপাদান, প্রোপেন ও বিউটেন, সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। প্রতি মাসে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ‘আরামকো’ এই দুই উপাদানের আন্তর্জাতিক বাজারদর প্রকাশ করে, যা বিশ্বজুড়ে সৌদি কার্গো মূল্য হিসেবে পরিচিত।
চলতি মাসের জন্য আরামকো তাদের সিপি রেট বা ভিত্তিমূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়ায় দেশের বাজারেও এর সুফল পাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। উল্লেখ্য, এই সৌদি সিপির সাথে ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় করে বিইআরসি প্রতি মাসে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির দাম কমার এই প্রবণতা হঠাৎ করে হয়নি, বরং এটি গত মাসের ধারাবাহিকতা। এর আগের মাসেও প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৫ টাকা কমানো হয়েছিল। তবে এবারের ৩৫৭ টাকার পতনটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একক মাসে সবচেয়ে বড় পতন।
এর ফলে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৭ টাকা ০৬ পয়সা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ১২৭ টাকা ৩০ পয়সায়। ১২ কেজি ছাড়াও বাজারে ৫, সাড়ে ১৫, ২০, ২৫, ৩৫ ও ৪৫ কেজির যেসব সিলিন্ডার রয়েছে, সেগুলোও এই প্রতি কেজির নতুন অনুপাত (১২৭.৩০ টাকা) অনুযায়ী কম দামে বিক্রি হবে।
এলপিজির দাম কমার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের ওপর। প্রতি লিটার অটো গ্যাসের দাম ১৬ টাকা ৫৩ পয়সা কমিয়ে এখন ৭০ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। এতে করে সড়ক পরিবহনের খরচও কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেসরকারি খাতের এলপিজির দামে বড় ধরনের ওঠানামা হলেও সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বরাবরের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির এই সিলিন্ডারটি আগের মতোই ৮২৫ টাকায় পাওয়া যাবে। তবে বাজারে সরকারি গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষকে মূলত বেসরকারি এলপিজির ওপরই নির্ভর করতে হয়।
বিইআরসি ২০২১ সালের এপ্রিল মাস থেকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। তবে প্রতি মাসেই দাম নির্ধারণ করা হলেও সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগ- মাঠপর্যায়ে এই দামের সঠিক প্রতিফলন দেখা যায় না।
খুচরা বিক্রেতারা প্রায়শই পরিবহন খরচ, ডিলারদের বাড়তি কমিশন বা কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি নিয়ে থাকেন। এবারের বিশাল মূল্য হ্রাসের পর সাধারণ মানুষের একমাত্র দাবি- সরকার যেন কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে খুচরা বাজারে এই ১,৫২৮ টাকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।