পুরান ঢাকার ধোলাইখাল এলাকার ব্যবসায়ী সিরাজুল হক। এক বছর আগেও চার ভাইয়ের পরিবার নিয়ে একসঙ্গে থাকতেন নিজেদের বাড়িতে। পিতাহারা পরিবারের মা ছিলেন সবার অভিভাবক। পরিবারের আনন্দ-বেদনা সবাই একসঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতেন। কিন্তু গত এক বছরের মধ্যে চার ভাই আলাদা হয়ে গেছেন। সবার পরিবারেই ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে। পারিবারিক চাহিদা বাড়ছে। দুই ভাই কাজের প্রয়োজনে চলে গেছেন অন্য এলাকায়। তেমন যোগাযোগও করা হয় না তাদের সঙ্গে। এসব কথা বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন পঞ্চাশোর্ধ সিরাজুল হক।
পরিবার’ শুধুমাত্র কোনো শব্দ নয়। পরিবার হলো বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব আর মায়ার বাঁধন। আত্মার আত্মীয়রা থাকেন পরিবারের সদস্য। সে পরিবার দিনে দিনে ছোট হয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে সামাজিক দূরত্ব। পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, বন্ধন ও পরিবারের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা এবং বাস্তবিক অর্থে পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের লক্ষ্যে প্রতিবছর ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরিবারের আকার ছোট হয়ে আসছে দেশে। বর্তমানে একটি পরিবারে গড়ে ৪.২ জন বসবাস করেন। এক বছর আগে যা ছিল ৪.৩ জন। মুসলিম ধর্মের অনুসারী পরিবারের তুলনায় সনাতন ধর্মে অনুসারী পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি। সবচেয়ে বড় পরিবার সিলেটে এবং ছোট রাজশাহীতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২ (এসভিআরএস)’ জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপটিতে নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে তিন লাখের বেশি খানা (পরিবার)। জরিপের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জরিপ এলাকার চার সদস্যবিশিষ্ট খানার অনুপাত ছিল ২৭.৪৩ শতাংশ, যা ২০২১ সালে ছিল ২৭.৭ শতাংশ। জরিপে অংশ নেয়া এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৫.৭ শতাংশ) খানার সদস্যসংখ্যা ১-৩ জন এবং প্রায় অর্ধেক খানার (৪৬ শতাংশ) সদস্যসংখ্যা ৪-৫ জন। এছাড়া প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (১৮.৪) খানার সদস্যসংখ্যা এখনও ছয়জন বা তারও বেশি বলে উঠে এসেছে। শহরের তুলনায় গ্রামে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি।
এসবিআরএসের তথ্য বলছে, পল্লী অঞ্চলের খানার গড় সদস্য ৪.২৪ জন। সিটি কর্পোরেশনের খানার আকার চারজন এবং পৌরসভা ও শহরের অন্যান্য অংশের খানার গড় সদস্যসংখ্যা ৪.১০ জন। ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে খানাগুলোর বিন্যাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর পরিবারের গড় আকার সবচেয়ে বড়। এ পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৪.২১ জন। এরপরই রয়েছে মুসলিম ধর্মাবলম্বী পরিবার। তাদের পরিবারের গড় আকার ৪.১৯ জন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা ৪.১৭ জন এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী পরিবারের গড় সদস্য ৪.০৮ জন।
বাংলাদেশের সমাজ মূলত একটি পুরুষপ্রধান। এ কারণে বেশিরভাগ পরিবারই পুরুষ সদস্যের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ৮২.৬৩ শতাংশ খানার প্রধান হলেন পুরুষ, ১৭.৩৬ শতাংশ খানার প্রধান নারী এবং ০.০১ শতাংশ খানার প্রধান হিজড়া। মোটা দাগে পুরুষরা খানার প্রধান হবার ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি এগিয়ে আছেন। বিবিএসের জরিপে বলা হয়েছে, নারীরা সম্পদের অধিকার, ঋণপ্রাপ্তি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় কম সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর ফলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, যেসব খানার প্রধান নারী, সেসব খানা পুরুষপ্রধান খানার তুলনায় দরিদ্র এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় সক্ষমতা কম।
সমাজতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন এশিয়ান সোশ্যাল সায়েন্স স্টাডির ফেলো অধ্যাপক ড. আফতাব আহমেদ। তিনি বলেন, একসময় আমাদের দেশে একান্নবর্তী পরিবার ছিল। অনেক সদস্য নিয়ে পরিবার গঠন হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিবারগুলো এখন আর নেই। এখন পরিবারের আকার ছোট হয়ে পড়েছে। তার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন, পারিবারিক কলহ ও নগরায়ণ অনেকাংশে দায়ী। মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে পরিবারের সঙ্গে জন্মগত দিক থেকে সম্পৃক্ত। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক নানান বাস্তবতায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় রাখতে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব রাখতে হবে।