হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে (WHCD) ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং জনপ্রিয় লেট-নাইট টকশো হোস্ট জিমি কিমেল।
কিমেলের একটি কৌতুককে “বিদ্বেষমূলক এবং সহিংস” আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এবিসি (ABC) নেটওয়ার্কের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মেলানিয়া।
গত শনিবারের সেই ডিনারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে উপস্থিত ছিলেন মেলানিয়া। সেখানে এক বন্দুকধারী গুলি চালালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে জিমি কিমেল তার শো-তে মেলানিয়াকে নিয়ে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে পুরো আমেরিকায়।
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার, যখন জিমি কিমেল আসন্ন করেসপন্ডেন্টস ডিনার নিয়ে একটি প্যারোডি বা ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান করছিলেন। সেখানে মেলানিয়া ট্রাম্পের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে কিমেল বলেন, আমাদের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া এখানে আছেন। মেলানিয়ার দিকে তাকান, কত সুন্দর। মিসেস ট্রাম্প, আপনার চেহারায় এক উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠছে, ঠিক যেন এক ‘অপেক্ষমাণ বিধবার মতো।
শনিবারের ডিনারে বন্দুক হামলার ঘটনার পর কিমেলের এই ‘বিধবা’ সংক্রান্ত রসিকতাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। সমালোচকদের মতে, প্রেসিডেন্টের ওপর হামলার ঠিক আগমুহূর্তে এ ধরনের মন্তব্য কেবল কৌতুক নয়, বরং এটি একটি অশুভ ইঙ্গিত বা সহিংসতার প্রচ্ছন্ন উসকানি।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি দীর্ঘ পোস্টে নিজের ক্ষোভ উগড়ে দেন মেলানিয়া ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘কিমেলের মতো মানুষের উচিত নয় প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের ড্রয়িংরুমে ঢুকে ঘৃণা ছড়ানোর সুযোগ পাওয়া।’ তিনি সরাসরি এবিসি নেটওয়ার্কের নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন তোলেন, আর কতদিন তারা কিমেলের এই ‘জঘন্য আচরণ’ সহ্য করবে।
মেলানিয়া আরও যোগ করেন, ‘আমার পরিবারকে নিয়ে তার এই মনোলগ কোনো কমেডি নয়—তার শব্দগুলো ক্ষয়কারী এবং আমেরিকার রাজনৈতিক অসুস্থতাকে আরও গভীর করে তুলছে। আমাদের সমাজের বিনিময়ে এবিসি কর্তৃপক্ষ কেন কিমেলকে বারবার এসব করার সুযোগ দিচ্ছে?
ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সহিংসতার আশঙ্কায় চুপ থাকেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও। তিনি তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ কিমেলের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। ট্রাম্প লিখেন, ‘জিমি কিমেলের মন্তব্য সাধারণ শালীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি সরাসরি সহিংসতার ডাক। ডিজনি এবং এবিসি-র উচিত তাকে অবিলম্বে বরখাস্ত করা।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও এক সংবাদ সম্মেলনে কিমেলের সমালোচনা করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট, ফার্স্ট লেডি এবং তাদের সমর্থকদের নিয়ে এই ধরনের বাগাড়ম্বর সম্পূর্ণ উন্মাদনা।
শনিবার রাতে ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে আয়োজিত এই বার্ষিক গালা ডিনারে যখন শত শত সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং তারকারা উপস্থিত ছিলেন, ঠিক তখনই হোটেলের একটি নিরাপত্তা চেকপয়েন্টের কাছে গুলি চালায় এক বন্দুকধারী। আতঙ্কে অতিথিরা টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্পকে অক্ষত অবস্থায় দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয় সিক্রেট সার্ভিস।
ট্রাম্প পরে সাংবাদিকদের জানান, এই ঘটনাটি তার স্ত্রী মেলানিয়ার জন্য অত্যন্ত ‘ট্রমাটিক’ বা মানসিক যন্ত্রণাদায়ক ছিল। হামলার দায়ে ৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোমবার আদালতে তার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জিমি কিমেল এর আগেও একই ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রক্ষণশীল ইনফ্লুয়েন্সার চার্লি কার্কের মৃত্যু নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর তাকে সাময়িকভাবে অফ-এয়ার বা শো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় কিমেল বলেছিলেন, ট্রাম্পের অনুগামীরা বা ‘মাগা গ্যাং’ চার্লি কার্কের মৃত্যুকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। তবে এক সপ্তাহ পরেই তিনি শো-তে ফিরে আসেন এবং তার মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।
কিমেলের এই সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে বয়কটের ডাক দিয়েছে রক্ষণশীলরা। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ‘বিধবা’ হওয়ার মতো রসিকতা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং বিপজ্জনক। অন্যদিকে, এবিসি নেটওয়ার্ক এখনো এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বিবিসি তাদের সাথে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আমেরিকার রাজনৈতিক মেরুকরণ যখন চরম পর্যায়ে, তখন বিনোদন জগতের ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক মন্তব্য এবং তার প্রতিক্রিয়া যে কতটা তীব্র হতে পারে, জিমি কিমেল ও মেলানিয়া ট্রাম্পের এই দ্বন্দ্ব তারই বহিঃপ্রকাশ। এখন দেখার বিষয়, এবিসি তাদের শীর্ষ রেটিংপ্রাপ্ত হোস্টের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না, না কি এটিও অন্য সব বিতর্কের মতো সময়ের সাথে ধামাচাপা পড়ে যায়।