হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববারের এ হামলায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) দুই সদস্য নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে মার্কিন সামরিক অভিযান স্থগিত হওয়ার পর ইরানে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র কমান্ডার টিম হকিন্স মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে জানান, লারাক দ্বীপে আইআরজিসির সদস্যদের দেখা গিয়েছিল। তারা হরমুজ প্রণালিতে রকেট নিক্ষেপ এবং সমুদ্র মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
হামলার পর এর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয় আইআরজিসি। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করে, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক এলাকায় থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এসব হামলায় মার্কিন ঘাঁটির প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনা ও যুদ্ধবিমান রাখার স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। তবে এসব দাবির স্বাধীন কোনো সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
আইআরজিসির পাল্টা হামলার দাবির পর জর্ডানের সেনাবাহিনী জানায়, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইআরজিসি। সংগঠনটির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এ হামলাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘কৌশলগত ও প্রাণঘাতী ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, এ সিদ্ধান্তের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই মূল্য দিতে হবে।
এর আগে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছিল, লারাক দ্বীপে ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বান্দার আব্বাসের কাছে অবস্থিত লারাক দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির ওপর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় একটি অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে এই নৌপথ ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে।
লারাক দ্বীপে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তেল অবকাঠামোয় বিস্ফোরণের কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এর মধ্যে কয়েকটি ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে মনে হয়েছে। একটি ভিডিও প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘খার্গ দ্বীপকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।’
ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত খার্গ দ্বীপে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প এই স্থাপনা দখলের হুমকি দিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ইরান সেখানে যে সমুদ্র মাইন স্থাপন করেছিল, সেগুলো ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে মাইন স্থাপনের চেষ্টা করা হলে তা ধ্বংস করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি ট্রাম্পের এ দাবিকে ‘প্রচারমূলক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। গত ২৪ আগস্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর লক্ষ্য ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানো বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করার পর পাল্টা হামলা চালায় ইরান। ইসরায়েল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ইরানি হামলার পর সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সংঘাত ছয় মাসে গড়ানোর মধ্যে কৌশলগত এই নৌপথ ঘিরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।