একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন সামরিক শক্তির আস্ফালনে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বেইজিং ও তেহরান অত্যন্ত গোপনে এবং সুনিপুণভাবে সাজিয়ে তুলেছে এক বিশাল ‘ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক দেয়াল’।
এটি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং ২৫০ বছরের মার্কিন আধিপত্য ও ১৯৭৪ সাল থেকে চলা ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার মরণঘণ্টা বাজানোর এক সুসংহত মহাপ্রকল্প।
বিখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবারের তথ্যমতে, ইরান ও চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে রণকৌশল গ্রহণ করেছে, তা মূলত প্রাচীন চীনা খেলা ‘গো’ (Weiqi) এবং পারস্যের চিরাচরিত ‘দাবা’র এক ধ্বংসাত্মক মিশ্রণ।
চীন বর্তমানে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে দুটি সমান্তরাল পথে। এর একটির নেতৃত্বে আছেন ঝানু কূটনীতিকরা এবং অন্যটি পরিচালিত হচ্ছে পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) সামরিক মুখপাত্রের মাধ্যমে।
চীনা সামরিক মুখপাত্রের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে একটি ‘যুদ্ধে আসক্ত’ জাতি। দেশটির ২৫০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছর তারা শান্তিতে ছিল। বেইজিং এই যুদ্ধকে কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই হিসেবে দেখছে না, বরং তারা একে একটি ‘বৈশ্বিক ও নৈতিক হুমকি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং কনফুসীয়বাদের আদর্শ ব্যবহার করে ওয়াশিংটনকে এমন একটি জাতি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, যারা তাদের নৈতিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলেছে। গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর কাছে এই বার্তাটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে পৌঁছে গেছে।
যুদ্ধের ময়দানে ইরানের বর্তমান সক্ষমতা দেখে সামরিক বিশ্লেষকরা স্তম্ভিত। ইরান এখন কেবল ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে না, বরং তারা পরিচালনা করছে একটি ‘চীনা প্রযুক্তিচালিত ডিজিটাল যুদ্ধ’।
ইরানের কৌশলগত গ্রিড এখন চীনের ‘বাইদু’ (Beidou) স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত। কক্ষপথে থাকা ৪০টিরও বেশি বাইদু স্যাটেলাইটের সহায়তায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম।
পশ্চিমা প্রযুক্তির জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করার ক্ষমতাকে অকেজো করে দিচ্ছে এই চীনা নেভিগেশন সিস্টেম। চীনের ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে ইরানকে দেওয়া হয়েছে অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা, যা মুহূর্তের মধ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি পদক্ষেপ শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সময় এখন কয়েক মিনিটে নেমে এসেছে।
চীন যখন কারিগরি ও ডিজিটাল সহায়তা দিচ্ছে, রাশিয়া তখন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা ‘প্যাট্রিয়ট’ বা ‘আইরিস-টি’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যেভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে, সেই জ্ঞান এখন ইরানের হাতে।
ইরান এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সমন্বয়ে ‘ড্রোন স্যাচুরেশন’ কৌশল প্রয়োগ করছে, যা যেকোনো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ফোর’-এ এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্ট দেখা গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চালটি এসেছে অর্থনৈতিক ফ্রন্টে। ইরান এখন হরমুজ প্রণালিতে কেবল সেই তেলের ট্যাংকারগুলো চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যেগুলোর লেনদেন ‘পেট্রো-ইউয়ানে’ সম্পন্ন হয়েছে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি ‘আর্থিক পারমাণবিক বোমা’।
১৯৭৪ সালে সৌদির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা চালু করেছিল, যেখানে বিশ্বের তেল বাণিজ্য ডলারে হতে হতো। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার বিশাল ঋণ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল-মিলিটারি কমপ্লেক্স’-এর অর্থায়ন করতে পারত। কিন্তু ইরান এখন সেই ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। বর্তমানে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি চীনের সিআইপিএস (CIPS) ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
বেইজিংয়ের পরিকল্পনাকারীরা ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ডিজিটাল অর্থনীতিকে জিডিপির ১২.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
চীন নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলছে যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং সামরিক শক্তি একই সুস্থ দেহের অঙ্গের মতো কাজ করবে। তাদের এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বাধা ছিল পেট্রোডলারের আধিপত্য। ইরান এখন সেই বাধা দূর করার কাজটি ত্বরান্বিত করছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বর্তমানে সান জুর রণকৌশল এবং চীনা ‘গো’ খেলার নীতি অনুসরণ করছে। ‘গো’ খেলায় ছোট পাথরগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন তারা বোর্ডজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
চীন ও ইরান গত কয়েক বছর ধরে ব্রিকস (BRICS), সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) এবং নিউ সিল্ক রোডের মাধ্যমে সেই পাথরগুলোই সাজিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এখন তাদের নিজস্ব ‘অহংকারের চোরাবালিতে’ আটকা পড়েছে। তাদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ আসলে চীন ও ইরানের সাজানো দাবার বোর্ডকেই পূর্ণতা দিচ্ছে।
পারস্যের দাবার চাল আর চীনের ধীরস্থির কৌশল মিলে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি এখন কেবল একটি নৌপথ নয়, এটি পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার শ্মশানে পরিণত হওয়ার পথে। চীন ও ইরানের এই সমান্তরাল রণকৌশল যদি সফল হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যেই আমরা এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা দেখব যেখানে ডলারের চেয়ে ইউয়ান এবং ওয়াশিংটনের চেয়ে ইউরেশীয় অক্ষ অনেক বেশি প্রভাবশালী হবে।
তথ্যসূত্র: দ্য ক্রেডল, এপি, রয়টার্স এবং পেপে এসকোবারের বিশ্লেষণ।