মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চূড়ান্ত অঙ্ক যেন আজ মঞ্চস্থ হলো। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার প্রধান মজিদ খাদেমির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ এখন আর পর্দার আড়ালে নেই; বরং তা পূর্ণমাত্রার এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এবং দেশটির সেনাবাহিনী (আইডিএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় সরাসরি সংঘাতের নজির।
মজিদ খাদেমি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তাই ছিলেন না, বরং ইরানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং ইসরায়েলের ভেতরে একাধিক গোয়েন্দা অভিযানের পরিকল্পনায় খাদেমির হাত ছিল।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের গোয়েন্দা এবং বিমান বাহিনীর নিখুঁত সমন্বয়ে এই অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। ইরানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের মস্তিষ্ককে আমরা স্তব্ধ করে দিয়েছি। ইসরায়েল নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত।
এই হামলার পর আইডিএফ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিমান হামলা চালিয়ে খাদেমিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে হামলাটি ঠিক কোথায় এবং কীভাবে চালানো হয়েছে, তা নিয়ে সামরিক গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে।
মজিদ খাদেমির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তেহরানে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে এই হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম খাদেমির ছবি প্রকাশ করে তাকে একজন ‘শহীদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
হামলার পর ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই রক্ত বৃথা যাবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির জবাবে ইরান আগেই বলেছিল যে তারা ‘আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী’ পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুত। এখন খাদেমির মৃত্যু সেই আগুনের শিখাকে আরও উসকে দিল। ইরানের শীর্ষ কমান্ডারদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে এই হামলা পরিচালনা করেছে এবং এর মূল্য তাদের চড়া দামে দিতে হবে।
মজিদ খাদেমি নিহতের খবরের প্রভাব কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, এর ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। তেলের বাজারের অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে।
বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ১১১.৪৩ ডলারে বিক্রি হচ্ছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত অচল। ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯৪ শতাংশ কমে গেছে। প্রায় ৩ হাজার জাহাজ বর্তমানে এই অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে।
চীন ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে যে, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিই এই প্রণালি খুলে দেওয়ার একমাত্র পথ। অন্যদিকে, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আলটিমেটামের ভাষা’ পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প ইরানকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন যে তিনি প্রয়োজনে ‘পুরো ইরান উড়িয়ে দেবেন’। তার এই মন্তব্যকে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ‘বিপজ্জনক ও মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই তেহরান প্রদেশে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ৬ শিশুর মৃত্যু এবং তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনাগুলো সাধারণ ইরানিদের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের আক্রমণ কেবল তেহরানে সীমাবদ্ধ নেই। ইস্টার সানডের পবিত্র দিনে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণে একটি ‘অপারেশনাল জোন’ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যার অর্থ হলো হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সরাসরি স্থলযুদ্ধের প্রস্তুতি।
পাল্টা আঘাত হিসেবে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের হাইফা শহরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক বেসামরিক নাগরিক আটকা পড়ার খবর পাওয়া গেছে, আর এখন পর্যন্ত ২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কুয়েত ও জর্ডান দাবি করেছে যে তারা তাদের আকাশসীমায় বেশ কিছু ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
একদিকে যখন যুদ্ধংদেহি মনোভাব, অন্যদিকে তখন পর্দার আড়ালে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান শান্তি প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ‘রাতভর’ যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ৪৫ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বর্তমানে একটি শান্তি প্রস্তাব রয়েছে, যাতে অবিলম্বে সংঘাতের অবসান এবং লজিস্টিক সাপোর্ট প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে ইরানকে আলটিমেটাম দিচ্ছেন এবং ইসরায়েল একের পর এক শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করছে, সেখানে এই শান্তি প্রস্তাব কতটা বাস্তবায়িত হবে?
মজিদ খাদেমির হত্যাকাণ্ডকে অনেক সামরিক বিশ্লেষক ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানি হত্যার সঙ্গে তুলনা করছেন। সোলেইমানি হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, খাদেমির মৃত্যু তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এবার ইসরায়েল সরাসরি দায় স্বীকার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে হামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি, ইরানে মার্কিন ক্রু উদ্ধারের অভিযানে ইসরায়েল সহায়তা করেছিল। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মজিদ খাদেমির মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং এটি একটি যুগের অবসান এবং সম্ভাব্য নতুন এক মহাযুদ্ধের শুরু। একদিকে ট্রাম্পের হুঙ্কার, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং তেলের আকাশচুম্বী দাম বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বড় মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন হবে বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের আসন্ন সংবাদ সম্মেলনে তিনি কী ঘোষণা দেন এবং ইরান তাদের ‘বিধ্বংসী’ পাল্টা হামলার হুমকি কীভাবে কার্যকর করে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। শান্তি প্রস্তাবের যে ক্ষীণ আশা জেগে আছে, তা কি বারুদের গন্ধে হারিয়ে যাবে, নাকি কোনো অলৌকিক উপায়ে থমকে যাবে এই রক্তপাত? উত্তর কেবল সময়ই দিতে পারে।