তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি আবারও চালু হয়েছে সুন্দরবনের মাছ ধরার মৌসুম। তবে বন খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের নদী ও খালে দেখা দিয়েছে পুরনো এক ভয়ংকর চিত্র—বিষ দিয়ে মাছ ধরা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এটিকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ‘চরম হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
বনের মধ্যে থাকা জলজপ্রাণী, মাছ ও পোনাগুলো প্রতিনিয়ত বিষক্রিয়ায় ধ্বংস হচ্ছে। এতে সুন্দরবনের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৩১ শতাংশ এলাকা জলাভূমি। এখানে ৪৫০টির বেশি নদী-নালা ও খাল রয়েছে। এছাড়া ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া ও অসংখ্য জলজপ্রাণী রয়েছে। এই মৎস্যসম্পদ থেকে প্রতিবছর সরকার বিপুল রাজস্ব আয় করে।
তবে কিছু অসাধু জেলে বৈধ পারমিট থাকলেও বনাঞ্চলে চোরাগোপ্তা পদ্ধতিতে বিষ প্রয়োগ করছেন। সাধারণত মধ্যভাটার সময় তারা খালের একপাশে জাল পেতে অন্য পাশে বিষ ঢালেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাছ দুর্বল হয়ে ভেসে উঠে এবং জালে আটকে পড়ে। ব্যবহৃত বিষের মধ্যে রয়েছে ‘রিপকট, ক্যারাটে, হিলডন, ওস্তাদ’ ও বিভিন্ন কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল করিম বলেন, “বিষযুক্ত মাছ খেলে প্রাথমিক প্রভাব দেখা যায় না, তবে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কিডনি, লিভার ও হৃদপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পশু-পাখির শরীরেও এ ধরনের বিষ দ্রুত প্রভাব ফেলে।”
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার জানান, “একবার কোনো খালে বিষ প্রয়োগ করা হলে সেখানে তিন থেকে পাঁচ দিন মাছ প্রবেশ করতে পারে না। এতে প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে খালগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। সুন্দরবনের অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।”
খুলনার কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, “আমরা সুন্দরবনে টহল জোরদার করেছি। যৌথবাহিনী নিয়মিত টহল দিচ্ছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাছ জব্দ হয়েছে। টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়ে খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা অনেকটাই কমেছে।”
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘কোস্টাল ক্লাইমেট মুভমেন্ট’-এর নেতা মো. আবির হোসেন বলেন, “সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। মাছ ধরার নামে বিষ প্রয়োগ মানে পুরো ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করা। এটি শুধু বন নয়, মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বিপদ ডেকে আনছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি, জিও-ট্র্যাকিং ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন।”