ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ দুই যুগ পর রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট পাওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই নতুন রাজনৈতিক দর্শনের রূপরেখা তুলে ধরেন।
দীর্ঘ ১৬ বছরের নির্বাসন ও সংগ্রামের পর ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি এখন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত। তবে এই বিজয়কে কেবল উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘দেশ গড়ার কঠিন দায়িত্ব’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান। শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন এখন আর পেছনে তাকানোর সময় নেই, এবার সময় ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার।
সাড়ে তিনটায় শুরু হওয়া এই সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই বাংলাদেশের সাধারণ ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনগণ যে আস্থা আমাদের ওপর রেখেছে, তার মর্যাদা রক্ষা করাই এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করব যে, জনগণের সরকার জনগণের জন্যই কাজ করে।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে ‘জাতীয় ঐক্য’ শব্দটির ওপর বারবার জোর দেন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আমাদের যেভাবে বিভক্ত করে রাখা হয়েছিল, তা দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। মনে রাখবেন, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, আর বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে সবাই এক থাকবে।
বিজয় উদ্যাপন প্রসঙ্গে নেতা-কর্মীদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা অত্যন্ত শান্তভাবে বিজয় উদ্যাপন করছি। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা প্রতিহিংসা বরদাস্ত করা হবে না। আমি দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিচ্ছি, যাতে কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য ও তারেক রহমানের বক্তব্যের আলোকে এবারের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি এককভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনার সামর্থ্য অর্জন করেছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের স্থগিত দুটি আসনেও (চট্টগ্রাম-২ ও ৪) বিএনপির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। তারেক রহমান সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান।
বক্তব্য শেষে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন তারেক রহমান। বিদেশি সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে আগামী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখবে। বিনিয়োগ ও উন্নয়নের জন্য আমরা একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করব।
অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের অবারিত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে বলে তিনি অঙ্গীকার করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের এই বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। নির্বাচনের পর যেখানে সাধারণত বিজয়ীদের মধ্যে দাম্ভিকতা দেখা যায়, সেখানে তারেক রহমানের ‘দেশ গড়ার পালা’ এবং ‘দায়িত্বশীল ভূমিকা’র ডাক এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে বলরুম ত্যাগ করার সময় তারেক রহমান আবারও হাত নেড়ে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে নতুন এক ভোরের জন্য কাজ করি।