বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো জ্বালানি খাত। এই জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গত কয়েক দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড।
১৯৫৫ সালে হরিপুরে প্রথম গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা, আজ ২০২৬ সালে এসে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
একঝাঁক দক্ষ কর্মকর্তার সমন্বয়ে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড এখন দেশের জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ইতিহাসের সমান্তরাল।
১৯৫৫ সালে পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম কর্তৃক হরিপুরে গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমেই এই অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ সম্পদের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর নজরে আসে। ১৯৬০ সালে ছাতক সিমেন্ট কারখানায় গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৮২ সালের ৮ মে, যখন কোম্পানি আইন ১৯১৩ এর আওতায় এটি নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের অন্যতম স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিনটি হলো ১৯৮৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর।
সেদিন হরিপুরের ৭ নম্বর কূপে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এই ঘটনা তৎকালীন সময়ে দেশের জ্বালানি খাতে এক বিশাল আশার আলো সঞ্চার করেছিল।
বর্তমানে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের হাল ধরেছেন প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন। তাঁর দিকনির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি গতানুগতিক উৎপাদন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেনের গতিশীল নেতৃত্বে কোম্পানির কর্মকর্তারা দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন কূপ খনন এবং পুরাতন কূপ পুনঃখনন বা ওয়ার্কওভার প্রক্রিয়ায় রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
প্রশাসনিক সমন্বয় ও কৌশলগত পরিকল্পনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, যা কর্মকর্তাদের কাজের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। কর্মকর্তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে বর্তমান নেতৃত্বের সরাসরি অংশগ্রহণমূলক নীতি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সুসংগঠিত পরিবারে রূপান্তর করেছে।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড শুধু গ্যাস উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০০৯ সালে নিজস্ব ঘনীভূত তরল হাইড্রোকার্বন পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট বা কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট চালুর পর থেকে এটি দেশের পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা মেটাতে অবদান রাখছে।
বর্তমানে রশিদপুরে স্থাপিত ঘনীভূত তরল হাইড্রোকার্বন পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট এবং অনুঘটক পুনর্গঠন ইউনিট বা ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিটের মাধ্যমে এখান থেকে উচ্চমানের পেট্রোল, অক্টেন, ডিজেল এবং কেরোসিন উৎপাদিত হচ্ছে।
এই উৎপাদন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড বর্তমানে হরিপুর, কৈলাশটিলা, রশীদপুর, বিয়ানীবাজার ও ছাতক এই পাঁচটি প্রধান গ্যাস ক্ষেত্র পরিচালনা করছে।
হরিপুর হলো দেশের প্রাচীনতম ক্ষেত্র এবং একমাত্র তেল উৎপাদনকারী ক্ষেত্র। কৈলাশটিলা উচ্চ চাপের গ্যাস এবং প্রচুর পরিমাণ ঘনীভূত তরল হাইড্রোকার্বন বা কনডেনসেট সমৃদ্ধ। রশীদপুর জাতীয় গ্রিডে বড় অংকের গ্যাস সরবরাহ করে।
বিয়ানীবাজার থেকে নিয়মিত গ্যাস ও মূল্যবান তরল হাইড্রোকার্বন পাওয়া যাচ্ছে। ঐতিহাসিক ছাতক ক্ষেত্রটি পুনরায় সক্রিয় করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
মলিকুলার সিভ টার্বো এক্সপ্যান্ডার বা এমএসটিই প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এনজিএল পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। কৈলাশটিলা এনজিএল প্ল্যান্টের মাধ্যমে বহুমুখী জ্বালানি উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।
২০১৯ সালে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লুৎফর রহমানের আকস্মিক মৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তবে সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বর্তমান প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জায়গায় নিয়ে এসেছে।
বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন এবং কোম্পানি সচিবের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন এখন উদাহরণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সরকারের রূপকল্প ২০৩০ বাস্তবায়নে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে প্রতিষ্ঠানটি গভীর কূপ খননের জন্য অত্যাধুনিক ত্রি-মাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপ বা থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করছে। পরিবেশ সুরক্ষায় আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার বা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করে গ্যাস পরিচালনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড কেবল একটি কোম্পানি নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ।
প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেনের সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কোম্পানি সচিবের প্রশাসনিক দক্ষতার মিশেলে প্রতিটি কর্মকর্তা আজ একেকজন সম্মুখ যোদ্ধা। দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য।
প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নতুন নতুন কূপ খনন ও অধিকতর গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড আগামী দিনে বাংলাদেশের জ্বালানি মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।