আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১১ (বাড্ডা-ভাটারা) এখন আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও ধানের শীষের প্রার্থী এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আগামীকাল রবিবার শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই আসনের প্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের করা এই লিভ টু আপিল যদি গৃহীত হয়, তবে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বিএনপি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ ফেব্রুয়ারি, যখন এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন নাহিদ ইসলাম। রিটে অভিযোগ করা হয় যে, এম এ কাইয়ুম দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর নাগরিক। নাহিদ ইসলামের দাবি, কাইয়ুম দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্যটি তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় সুকৌশলে গোপন করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে বা তা গোপন করলে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য পদের জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন।
তবে গত ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে নাহিদ ইসলামের সেই রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। হাইকোর্টের ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেই গত ৫ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় লিভ টু আপিল দায়ের করেন এনসিপি প্রধান।
নাহিদ ইসলামের অন্যতম আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুসা আজ শনিবার গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁরা হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা লিভ টু আপিলে কাইয়ুমের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা এবং তাঁকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বরাদ্দের সিদ্ধান্ত স্থগিত চেয়েছি। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট, তাই আমাদের লক্ষ্য আগামীকাল রবিবার বা ভোটের আগেই চেম্বার আদালতে এই শুনানি সম্পন্ন করা।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩ জানুয়ারি ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বাছাই শেষে কাইয়ুমের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২২ জানুয়ারি তাঁকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, রিটার্নিং কর্মকর্তা কাইয়ুমের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্যটি যথাযথভাবে যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
ঢাকা-১১ আসনে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির দুই প্রার্থীর মধ্যে এই আইনি লড়াইকে সাধারণ ভোটাররা বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখছেন। এম এ কাইয়ুম বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা এবং এই আসনে তাঁর বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। অন্যদিকে, এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম এই আসনের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন। আইনি মারপ্যাঁচে যদি কাইয়ুমের প্রার্থিতা স্থগিত বা বাতিল হয়, তবে সেটি ভোটের মাঠে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন কিংবা কোনো তথ্য গোপন করেন, তবে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে। এর আগে গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল। এম এ কাইয়ুমের ক্ষেত্রে ভানুয়াতুর নাগরিকত্বের অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে কিংবা আদালত যদি এ বিষয়ে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন, তবে ভোটের আগ মুহূর্তে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
আইনজীবীদের মতে, কাল রোববার আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করবেন কি না, তা জানা যাবে। যদি আদালত আবেদনটি আমলে নেন এবং স্থগিতাদেশ প্রদান করেন, তবে এম এ কাইয়ুম আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আর যদি আবেদনটি খারিজ হয়ে যায়, তবে কাইয়ুমের নির্বাচনী লড়াইয়ে আর কোনো বাধা থাকবে না।
ভোটের মাত্র চার দিন বাকি থাকতে এ ধরনের আইনি টানাপোড়েন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঢাকা-১১ আসনের সাধারণ ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিকে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে কাইয়ুম থাকবেন নাকি আদালতের রায়ে নাহিদ ইসলামের অভিযোগের জয় হবে—তার ফয়সালা হবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই।