বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক অবৈধতার রায় বহাল রেখেছেন। এর ফলে সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল হলো ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ এবং ‘গণভোট’ ব্যবস্থা।
আদালতের এই ঐতিহাসিক আদেশের পরপরই সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, দেশের আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নয়, বরং সম্পূর্ণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা আমাদের একটি প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আগামী সাধারণ নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনেই হবে, এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপরেখা- অর্থাৎ এটি কি ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নামে পরিচিত হবে নাকি ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকার বলা হবে, তা দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হবে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’-কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যা যা করা প্রয়োজন, সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে। আপিল বিভাগের রায়ে যে ৫৪টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, সেগুলোকে সামনে রেখেই পরবর্তী আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। আইনমন্ত্রীর মতে, এই রায়ের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণের দীর্ঘদিনের অন্তত চারটি প্রধান জনআকাঙ্ক্ষা ও দাবির পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটেছে।
আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়, কী ঘটেছিল আদালতে?
বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। এর আগে, ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কয়েকটি ধারা ও উপধারাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। একই সাথে সংবিধানে গণভোটের বিধানও ফিরিয়ে এনেছিলেন উচ্চ আদালত। তবে তৎকালীন রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।
পরবর্তীতে, গত বছরের ৩ নভেম্বর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ বাতিলের দাবিতে একটি লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করেন। এরপর ১৩ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সেই আপিল শুনানির অনুমতি দেন। দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনা শেষে আজ সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার আদেশ দেন, যার ফলে আইনিভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হলো।
সংবিধানে বড় পরিবর্তনের হাওয়া, আগামী সংসদের এজেন্ডা
আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে কেবল নির্বাচন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং জনআকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়ে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ উত্থাপন করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। এর মাধ্যমে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ
আইনজীবীদের মতে, আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তীব্র সংকট ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, এই রায়ের ফলে তা নিরসনের একটি আইনি কাঠামো তৈরি হলো।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরে আসায় দেশের যেকোনো মৌলিক বা নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলো, যা গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে আরও শক্তিশালী করবে। একই সাথে, আগামী নির্বাচন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ কাঠামোর অধীনে হওয়ার নিশ্চয়তা মেলায় সাধারণ ভোটারদের মাঝেও ভোট প্রদানের আগ্রহ ও আস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার সর্বস্তরের মানুষের মতামত নিয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চূড়ান্ত রূপরেখা কীভাবে নির্ধারণ করে এবং আগামী সংসদ অধিবেশনে সংবিধানের এই ঐতিহাসিক সংশোধনীর রূপান্তর কীভাবে বাস্তবায়িত হয়।