বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে আগামী ১৬ বা ১৭ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনতান্ত্রিক অনাচারের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী যে নতুন যাত্রাপথ তৈরি হয়েছে, তার এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে আসন্ন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে। এবারের সংসদ সদস্যরা কেবল আইনপ্রণেতা হিসেবেই নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের কারিগর হিসেবেও দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই নতুন রাজনৈতিক রূপরেখার বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। একই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের শপথের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
আলী রীয়াজ তাঁর বক্তব্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন ঘোষণা প্রদান করেন। তিনি জানান, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কেবল প্রথাগতভাবে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না, বরং তাঁদের নিতে হবে দ্বৈত শপথ। প্রথমত জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ, যা সংবিধান অনুযায়ী নিয়মিত সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার আইনি ভিত্তি দেবে। দ্বিতীয়ত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ, এটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গৃহীত সংস্কার প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার।
আলী রীয়াজ বলেন, এই দ্বৈত শপথের লক্ষ্য হলো, জনগণ যে পরিবর্তনের ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা যেন আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোতে স্থায়ী রূপ পায়। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গঠিত জুলাই সনদ বা সংস্কারের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন আলী রীয়াজ। তিনি এই গণরায়কে গত দেড় দশকের অনাচারের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করা নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেওয়া।
আলী রীয়াজ উল্লেখ করেন, সংস্কারের পক্ষে এক বিশাল গণরায় এসেছে। এটি মূলত জুলাই বিপ্লবেরই এক প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ১৬ বছরের বৈষম্য ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, এই নির্বাচন এবং পরবর্তী সংস্কার কার্যক্রম সেই আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আলী রীয়াজ একটি চমকপ্রদ তথ্য শেয়ার করেন। তিনি জানান, সংসদ নির্বাচনের চেয়ে গণভোটে ভোটার উপস্থিতির হার প্রায় এক শতাংশ বেশি ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ কেবল নেতা নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের বিষয়ে অধিকতর আগ্রহী। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার মূল দায়িত্ব এখন দলগুলোর কাঁধে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি আন্তরিকতা ও সততা থাকে, তবে এই সংস্কার বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত সহজ হবে।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ১৬ বা ১৭ ফেব্রুয়ারি এই শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই অনুষ্ঠানটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার পর এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুরুর সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাধারণত সংসদ সদস্যরা কেবল সংবিধান রক্ষা ও আইন প্রণয়নের শপথ নেন। কিন্তু এবার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে অতিরিক্ত শপথ নেওয়ার বিষয়টি কেন আলোচনায় তার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করে গত কয়েক দশকে সংবিধানের যে বিভিন্ন সংশোধনী নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিরসন করে একটি বৈষম্যহীন সংবিধান প্রণয়ন করা।
সংসদীয় একনায়কতন্ত্র রোধ করে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও সংসদের মধ্যে ক্ষমতার যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করা। সংস্কার প্রক্রিয়ায় যেন কোনো রাজনৈতিক দল পরবর্তীতে নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন আনতে না পারে, তার একটি নৈতিক ও আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করা।
আলী রীয়াজের বক্তব্যে একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কতাও ছিল। তিনি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক ঐক্য ছাড়া এই বৃহৎ সংস্কার প্রকল্প সফল করা সম্ভব নয়। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জনমনে যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক দলগুলো জনরোষের মুখে পড়তে পারে। তাই আলাপ-আলোচনা ও ঐক্য বজায় রাখাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
১৬ ফেব্রুয়ারির শপথ কেবল ব্যক্তি সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর পুনর্নির্মাণের এক আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা করবে। আলী রীয়াজের এই ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে, আসন্ন সংসদ হবে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত অথচ শক্তিশালী একটি সংস্কারবাদী সংসদ।
জুলাইয়ের শহীদানদের রক্ত এবং পঙ্গুত্ববরণকারী হাজারো তরুণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলো কতটা কাজে লাগাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ পরবর্তী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।