বাংলাদেশের বাজারে অস্থিরতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দাম। মাত্র দুদিন আগে দাম কিছুটা কমলেও সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিলেন না ব্যবসায়ীরা। এক লাফে স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী করে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
সোমবার সকাল থেকেই কার্যকর হওয়া নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের দাম এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বাজুস সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণ বা ‘তেজাবি স্বর্ণের’ সরবরাহ ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেই এই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা হলেও এবার বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। সোমবার সকালে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির এক জরুরি সভায় এই দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং সকাল ১০টা থেকেই তা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম এখন থেকে পড়বে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা। গতকাল পর্যন্ত যা ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। অর্থাৎ ভরিতে এক ধাক্কায় বেড়েছে ২ হাজার ২১৬ টাকা। অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।
নতুন তালিকা অনুযায়ী স্বর্ণের দাম সব ক্যারেটেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি প্রতি দাম পূর্বে ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকায়। এতে ভরি প্রতি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২ হাজার ২১৬ টাকা।
২১ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি প্রতি দাম আগে ছিল প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৩ টাকা। এই ক্যারেটেও ভরি প্রতি দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ক্ষেত্রে পূর্বে ভরি প্রতি দাম ছিল প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৫২ টাকা। নতুন দামে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৮ টাকায়। এখানেও ভরি প্রতি স্বর্ণের দাম বেড়েছে ২ হাজার ২১৬ টাকা।
এছাড়া সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ভরি প্রতি দাম পূর্বে ছিল প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৬৯ টাকা, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৫ টাকা। সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণেও ভরি প্রতি দাম বেড়েছে ২ হাজার ২১৬ টাকা।
চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকেই স্বর্ণের বাজারে যেন দড়ি টানাটানি চলছে। বছরের মাত্র ৩৯ দিনে দেশের বাজারে মোট ২৮ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে ১৮ বার, আর কমানো হয়েছে মাত্র ১০ বার। বারবার দামের এই পরিবর্তন সাধারণ ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, যারা বিয়ের কেনাকাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য এই দাম বৃদ্ধি বড় ধরনের দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বর্ণের দাম হু হু করে বাড়লেও সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলো রুপার বাজার। বাজুস জানিয়েছে, দেশের বাজারে রুপার দাম বর্তমানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আগের মতোই ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৩৫৭ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৬ হাজার ৬৫ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট ৫ হাজার ১৯০ টাকায় স্থির আছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা এখন কাগুজে মুদ্রার চেয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ মনে করছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ায় স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। তবে বাংলাদেশে যেভাবে দ্রুততম সময়ে বারবার দাম পরিবর্তন করা হচ্ছে, তাতে খুচরা পর্যায়ে জুয়েলারি ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাজুস সাধারণ ক্রেতাদের অনুরোধ জানিয়েছে, যেন তারা অনুমোদিত ডিলার বা জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থেকে হলমার্ক করা স্বর্ণ ক্রয় করেন।