শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন
Title :

ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র লড়ে ৭ প্রার্থীর বাজিমাত

  • Update Time : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ Time View

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নতুন সমীকরণ হাজির করেছে। প্রায় দুই দশক পর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরলেও, দলটির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাতজন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে যারা স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় হেভিওয়েট প্রার্থীদের পরাজিত করে সংসদের টিকিট নিশ্চিত করেছেন।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফলাফল পাওয়া গেছে। এতে বিএনপি ও তার জোটভুক্ত দলগুলো ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা পেয়েছে ৭৭টি আসন। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসনে জয়ী হলেও নজর কেড়েছেন সেই সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, যাদের শিকড় মূলত বিএনপিতেই প্রোথিত।

তৃণমূলের জনপ্রিয়তাকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন এই সাত নেতা। দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও তারা প্রমাণ করেছেন যে, নির্বাচনী মাঠে ‘প্রতীক’ নয়, বরং ‘ব্যক্তি’ ইমেজও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে আলোচিত বিজয়টি এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসন থেকে। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও পরিচিত মুখ রুমিন ফারহানা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র লড়াই করেন। তিনি ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি জোটের মনোনীত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব। রুমিন ফারহানা তাঁর চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়ে প্রমাণ করেছেন ওই এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান কতটা সুসংহত।

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে বিজয়ী হয়েছেন লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান নেতা। দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ‘মোটরসাইকেল’ প্রতীক নিয়ে তিনি ১ লাখ ৭ হাজার ৯০১ ভোট পান। তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসির (৮২,৭৬৯ ভোট)। ঘাটাইলের রাজনীতিতে লুৎফর রহমানের ব্যক্তিগত প্রভাব যে দলীয় প্রতীকের চেয়েও শক্তিশালী, এই ফলাফল তারই ইঙ্গিত দেয়।

ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনে বড় অঘটন ঘটিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর। তিনি ১ লাখ ৭ হাজার ২৪১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ (১,০০,৭৩৬ ভোট)। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র হওয়া সালমান ওমরকে নির্বাচনের আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী রেদোয়ান আহমদকে হারিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওন। ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে শাওন পেয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট। অন্যদিকে রেদোয়ান আহমদ পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট। শাওন ছিলেন উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক দিনাজপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল আহাদকে পরাজিত করেন। এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়েন।

কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৬০৪ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা ৬৬ হাজার ৪৫০ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।

চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে উপজেলা বিএনপির সাবেক নেতা আব্দুল হান্নান স্বতন্ত্র হিসেবে ৭৪,১৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বর্তমান বিএনপির প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদকে (৬৯,১৫৫ ভোট) ৫ হাজার ২০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকলেও বাকি আসনগুলোতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হলেও জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়ে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের জানান দিয়েছে।

এই সাত স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় বিএনপির জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, তৃণমূলের নেতাদের বাদ দিয়ে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রার্থী সবসময় ভোটাররা গ্রহণ করেন না। বিশেষ করে রুমিন ফারহানা বা লুৎফর রহমান আজাদের মতো প্রার্থীরা দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙলেও ভোটারদের আস্থায় কোনো চির ধরেনি।

বিদ্রোহী হিসেবে জয়ী হওয়া এই সাত সংসদ সদস্যকে বিএনপি পুনরায় দলে ফিরিয়ে নেবে কি না, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা। যেহেতু বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, তাই এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ভূমিকা সংসদে এবং এলাকার উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category