২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে এখন নির্বাচনী হাওয়া বইছে। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘সংখ্যালঘু তোষণ’ বা প্রমিনেন্ট হিন্দু আউটরিচ।
বিশেষ করে খুলনা-১ আসনে হিন্দু প্রার্থী দিয়ে দলটি যে চমক দেখিয়েছে, তা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি খুলনার ডুমুরিয়ায় এক বিশাল জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তারা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চান যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকবে না।
তার মতে, বাংলাদেশ একটি ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাগান’, যেখানে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার থাকবে।
আমির তার ভাষণে বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ দেশ কেবল মুসলমানদের নয়। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলেমিশে থাকে। আমরা তাদের জান-মাল এবং সম্মানের পাহারাদার হিসেবে কাজ করছি। কেউ যদি তাদের দিকে মন্দ দৃষ্টিতে তাকায়, আমরা তা সহ্য করব না।’
খুলনা-১ আসনটি ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এবং এখান থেকে সাধারণত হিন্দু প্রার্থীরাই জয়ী হয়ে আসছেন। এ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী, যিনি দলটির ডুমুরিয়া ইউনিটের হিন্দু কমিটির সভাপতি।
কৃষ্ণ নন্দীকে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন কট্টর ইসলামী দল থেকে হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জামায়াতের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন
ডা. শফিকুর রহমান তার প্রচারণায় শিল্পের পুনরুজ্জীবন এবং কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে চাকরির ক্ষেত্রে প্রার্থীর ধর্ম দেখা হবে না, বরং তার যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। শরিয়াহ ভিত্তিক আইন প্রণয়নের প্রবক্তা হয়েও দলটির এ সেকুলার ধাঁচের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও বিতর্ক দুই-ই সৃষ্টি করেছে।
একটা সময় বিএনপি এবং জামায়াত ছিল ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে এখন বিএনপি ও জামায়াতই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকেই একটি নিরাপদ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলছেন। তিনি পাহাড়ি ও সমতলের সব মানুষের সহাবস্থানের ওপর জোর দিচ্ছেন।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি বিএনপির নাম না নিলেও বংশবাদী রাজনীতির অবসানের ডাক দিয়েছেন, যা মূলত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির দিকেই ইঙ্গিত করে।
জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অতীতে কট্টরপন্থা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলার খবর আসছিল, তখন জামায়াতের এ হিন্দু তোষণ অবস্থানকে অনেকেই কৌশলগত চাল মনে করছেন।
যদিও দলটি দাবি করছে, তারা এখন আরও বেশি দায়িত্বশীল এবং সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুরা এখন এক দোটানায়। একদিকে বিএনপির ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে জামায়াতের সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এ বড় দুই দলের কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না অনেক সংখ্যালঘু পরিবার।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি সত্যিই কৃষ্ণ নন্দীর মতো প্রার্থীদের জয়ী করে আনতে পারে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের এ পরিবর্তন কি সত্যিই আদর্শিক, নাকি স্রেফ ভোটের রাজনীতি তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ২০২৬ সালের এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে।