উত্তর জনপদের শান্ত জনপদ ঠাকুরগাঁও আজ এক অনন্য উন্মাদনায় জেগে উঠেছে। দীর্ঘ ২২ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শনিবার এই জেলায় পা রাখছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত এই জনসভাকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সকাল গড়ানোর আগেই ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন বিশাল বড়মাঠটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
হাজার হাজার মানুষের স্লোগান, রঙ-বেরঙের ব্যানার আর ধানের শীষের প্রতীকে ছেয়ে গেছে পুরো শহর। সবার দৃষ্টি এখন আকাশের দিকে, কখন প্রিয় নেতার হেলিকপ্টারটি ঠাকুরগাঁওয়র মাটি স্পর্শ করবে। তারেক রহমান সর্বশেষ ২০০৩ সালে এক হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে এসেছিলেন।
এরপর সময়ের পরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ ২০২৬ সালে তিনি আবার এই জনপদে ফিরে আসছেন। এই দীর্ঘ সময়টি স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে ছিল এক আবেগঘন বিচ্ছেদ।
সদর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন, ২০০৩ সালের সেই শীতের দিনটির কথা আজও মনে পড়ে। তখন তারেক রহমান তরুণ নেতা ছিলেন, আজ তিনি আমাদের দলের কান্ডারি। তাকে সামনাসামনি দেখতে আসাটা এক পরম পাওয়া। জনসভাস্থল বড়মাঠের উত্তর গেট দিয়ে যখন একের পর এক মিছিল ঢুকছে, তখন সবার নজর কাড়ছেন বিশেষ কিছু ভক্ত। ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশগাড়া গ্রামের মাজেদুল ইসলাম কিংবা দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে আসা মো. বাদশা নিজেদের সারা শরীর ধানের শীষে মুড়িয়ে ফেলেছেন।
তাদের বিশ্বাস, তারেক রহমান যখন মঞ্চ থেকে এই অনন্য দৃশ্য দেখবেন, তখন তিনি তৃণমূলের কর্মীদের ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারবেন। একটি ট্রাকে ধানের শীষ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি।
সেখানে পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রাজিয়া সুলতানা বলেন, এটি শুধুমাত্র একটি দলীয় প্রতীক নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রতীক। তারেক রহমানের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম ও ভোট দেব কিসে ধানের শীষে এমন সব গগনবিদারী স্লোগানে মাঠের পরিবেশ এখন টানটান উত্তেজনায় পূর্ণ।
ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা হরিপুর থেকে সকাল ৯টার আগেই ৫৫ জন সঙ্গী নিয়ে হাজির হয়েছেন তৈয়ব আলী। তিনি জানান, তারেক রহমান যেদিন লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছিলেন, সেদিনও তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। নেতার প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে এত দূর টেনে এনেছে।
শুধু হরিপুর নয়, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী জেলা দিনাজপুর ও গাইবান্ধা থেকেও কর্মীরা বাস, ট্রাক ও মাইক্রোবাসে করে এসেছেন। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে যানবাহনগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে তারা মাইলের পর মাইল হেঁটে জনসভাস্থলে প্রবেশ করছেন।
জনসভায় শুধুমাত্র নিবন্ধিত নেতাকর্মীই নয়, সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। পীরগঞ্জের জাবরহাট থেকে আসা হাসান নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী মনে করেন না। কিন্তু তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তৃতাগুলো তাকে মুগ্ধ করেছে।
তিনি বলেন, আমি রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু লোকটার কথাগুলো আমার মনে ধরেছে। সুযোগ পেলে তার সাথে একটা ছবি তোলার শখ আছে আমার। নারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। রানীশংকৈল থেকে আসা মাসুমা বেগম বলেন, খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম তাঁকে মুগ্ধ করে। তাঁরা চান একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ, যেখানে সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকবে।
মঞ্চের ঠিক সামনে বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে একটি বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। যেখানে কেন্দ্রীয় নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আসন গ্রহণ করবেন। মাঠের এক পাশে আলাদাভাবে বসার জায়গা রাখা হয়েছে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রাণ হারানো শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য। মঞ্চ থেকে স্থানীয় নেতারা বক্তৃতা দিচ্ছেন। তাঁদের কণ্ঠে ফুটে উঠছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান এবং খালেদা জিয়ার ত্যাগের কথা।
দলীয় সূত্রমতে, তারেক রহমান আজ সকাল ১০টায় ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে করে নীলফামারীর সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
সেখান থেকে বেলা ১১টায় হেলিকপ্টার যোগে ঠাকুরগাঁওয়ে অবতরণ করবেন। সাড়ে ১১টায় জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। ভাষণ শেষে দুপুর ১টার দিকে তিনি আবার নীলফামারীর উদ্দেশ্যে আকাশপথে রওনা দেবেন।
বিশেষ করে বড় বড় সংসদীয় আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বা দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থার সুযোগে বিএনপি তাদের ভোটব্যাংক সংহত করার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশ এখন মেঘমুক্ত, রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় লক্ষাধিক মানুষের অপেক্ষা যেন দীর্ঘতর হচ্ছে।
মাইকে যখনই ঘোষণা আসছে আমাদের নেতা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছাবেন, তখনই পুরো মাঠ উত্তাল হয়ে উঠছে। বাইশ বছর পর তারেক রহমান এই অঞ্চলের মানুষের জন্য কী ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে পুরো দেশ।