যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির প্রভাবশালী এমপি এবং সাবেক ট্রেজারি মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকী-কে দুর্নীতির অভিযোগে দ্বিতীয় দফায় কারাদণ্ড প্রদান করেছে বাংলাদেশের একটি আদালত। রাজধানীর একটি বিশেষ জজ আদালত তাকে ৪ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করার পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়াকে ‘অন্যায়’ ও ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করে কঠোর সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টি। সোমবার ঢাকার আদালতে শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলা পৃথক দুটি দুর্নীতির মামলার রায়ে এই দণ্ড ঘোষণা করা হয়। এই রায়ের মাধ্যমে টিউলিপের মোট সাজার মেয়াদ এখন দাঁড়িয়েছে ৬ বছর।
বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া এই রায় অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দের অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিকীকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর আগে, ২০২৫ সালের শেষের দিকে তাকে অন্য একটি দুর্নীতি মামলায় ২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
গত ডিসেম্বরের সেই রায়ে আদালত বলেছিল, টিউলিপ তাঁর খালা শেখ হাসিনাকে ‘বিশেষ ক্ষমতা’ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাবিত করে ঢাকার উপকণ্ঠে (পূর্বাচলে) একটি মূল্যবান প্লট নিজের নামে বরাদ্দ করিয়েছিলেন। নতুন এই ৪ বছরের সাজা আগের সাজার সঙ্গে যুক্ত হবে।
টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে এই রায় ঘোষণার পরপরই লন্ডনে লেবার পার্টির একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন:
অন্যায্য বিচার: “টিউলিপ সিদ্দিকী এই মামলায় কোনো ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পাননি। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে সম্পর্কেও তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
আইনি অধিকার হরণ: আইনজীবীদের মাধ্যমে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকা উচিত। যেহেতু এখানে তা হয়নি, তাই আমরা এই রায়কে স্বীকৃতি দিতে পারি না।
হাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট আসনের এই ব্রিটিশ এমপি শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করে আসছেন। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই পুরো প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ এবং একটি প্রহসন মাত্র। আমি এই ঘটনায় পুরোপুরি স্তম্ভিত। গত দেড় বছর ধরে তারা (বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ) আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে, অথচ আজ পর্যন্ত তারা আমার সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই টিউলিপ সিদ্দিকীর ওপর চাপ বাড়তে থাকে। তাঁর খালার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মালিকানাধীন লন্ডনের সম্পত্তি ব্যবহার এবং পারিবারিক সম্পর্কের জেরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাজ্যের ট্রেজারি মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
যদিও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নীতি উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাস জানিয়েছিলেন যে, টিউলিপের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি ‘অসততার প্রমাণ’ পাওয়া যায়নি, তবে পারিবারিক সম্পর্কের কারণে সরকারের ‘সম্মানহানির ঝুঁকি’ সম্পর্কে তাঁর আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। টিউলিপ তাঁর পদত্যাগপত্রে বলেছিলেন, তিনি ‘পূর্ণ স্বচ্ছতার’ সাথে কাজ করেছেন, তবে সরকারের কাজে বিঘ্ন ঘটাতে চান না বলেই সরে দাঁড়িয়েছেন।
টিউলিপের পাশাপাশি তাঁর খালা ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বোন আজমিনা সিদ্দিকী এবং ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি-কেও এই মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যে ছাত্র আন্দোলনের ওপর চালানো ক্র্যাকডাউনের দায়ে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং এই বিচার প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
টিউলিপ সিদ্দিকী একজন ব্রিটিশ নাগরিক এবং এমপি হওয়ায় এই রায় নিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। লেবার পার্টি যেহেতু এই রায়কে ‘অস্বীকৃতি’ জানিয়েছে, সেহেতু আন্তর্জাতিক মহলে এই বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কও বর্তমানে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন।
টিউলিপ সিদ্দিকীর এই সাজা ব্রিটেনের রাজনীতিতে তাঁর ক্যারিয়ারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার এবং লেবার পার্টি তাঁকে সমর্থন দিলেও, বাংলাদেশের আদালতের এই পরোয়ানা আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি নিউজ