বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই নির্বাচনে কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তনই নয়, বরং প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে তরুণ প্রজন্মের এক নতুন স্পর্ধার দেখা মিলেছে রাজধানী ঢাকার রাজপথে।
ঢাকা-৯ (খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা) আসনে ১২ জন প্রার্থীর ভিড়ে সবার নজর কেড়েছিলেন অক্সফোর্ড ফেরত তরুণ চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ডা. তাসনিম জারা। যদিও তিনি জয়ী হতে পারেননি, তবে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়া স্বতন্ত্র হিসেবে তিনি যে ভোট পেয়েছেন, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যখন নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর স্বপ্ন দেখা দিচ্ছিল, তখন ডা. তাসনিম জারা জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। দল থেকে তাকে ঢাকা-৯ আসনের মনোনয়নও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এনসিপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আদর্শিক অবস্থান থেকে তিনি সেই জোটকে গ্রহণ করতে পারেননি। গত ২৭ ডিসেম্বর দল থেকে পদত্যাগ করে তিনি ঘোষণা দেন—স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই তিনি লড়বেন।
একজন নতুন প্রার্থী হিসেবে কোনো দলীয় প্রতীক বা বড় কোনো ক্যাডারের সমর্থন ছাড়া নির্বাচন করা ছিল তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে তিনি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং তার মার্কা হিসেবে বেছে নেন ‘ফুটবল’।
বাংলাদেশের নির্বাচনে সাধারণত লাউড স্পিকারের শব্দদূষণ, দেয়াল জুড়ে পোস্টার আর বিশাল শোডাউনের সংস্কৃতি দেখা যায়। ডা. তাসনিম জারা এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক সাহসী অবস্থান নেন। তার প্রচারণায় কোনো মাইকিং বা পোস্টারের ব্যবহার ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণের সেবা দেওয়ার জন্য ক্ষমতার দাপট দেখানোর প্রয়োজন নেই।
তিনি তার প্রচারণাকে নিয়ে যান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এবং সরাসরি ভোটারদের দ্বারে। গত ২৫ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর আহ্বান জানালে অভাবনীয় সাড়া পান। তার নির্বাচনী পোর্টালে ১৯ হাজার ৭৩১ জন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার হয়ে কাজ করার জন্য নিবন্ধন করেন। এই তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরাই খিলগাঁও-সবুজবাগের অলিগলিতে গিয়ে জারার হয়ে ভোট চেয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা-৯ আসনে মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৫৬ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ২১ হাজার ৬৮১ জন। এই আসনে ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৪৬০ ভোট।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ডা. তাসনিম জারা পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। শতাংশের হিসাবে তিনি মোট বৈধ ভোটের প্রায় ২১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। যেখানে বড় বড় অনেক রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ৫ হাজার ভোটের কোটাও পার করতে পারেননি, সেখানে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৪৪ হাজারের বেশি ভোট পাওয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন।
ডা. তাসনিম জারা পেশায় একজন চিকিৎসক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যা ৭২ লাখের বেশি। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্য বিষয়ক কাজের মাধ্যমে মানুষের যে আস্থা তিনি অর্জন করেছেন, সেটি নির্বাচনে তাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। সাধারণ ভোটাররা তাকে একজন শিক্ষিত ও মার্জিত প্রার্থী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যা তার বিশাল ভোট ব্যাংক তৈরির অন্যতম কারণ।
নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী সময়ে ডা. জারা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করলেও প্রচারণার শেষ দিনে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখেছি। অর্থ ও পেশিশক্তি ছাড়া যে রাজনীতি করা সম্ভব, তা আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি।
যদিও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেননি, তবে ৪৪ হাজার ৬৮৪ জন ভোটারের এই সমর্থন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ এখন চিরাচরিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে শিক্ষিত ও স্বচ্ছ ইমেজের প্রার্থীদের খুঁজছে। তাসনিম জারার এই যাত্রা হয়তো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে আরও অনেক তরুণ ও মেধাবীদের আসার পথ প্রশস্ত করবে।