দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকার গুলশান-২ এলাকার আবহাওয়া ছিল টানটান উত্তেজনায় ঠাসা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে গুলশান মডেল হাই স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এই কেন্দ্রটি ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তারেক রহমান নিজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোট প্রদানের পর পৌনে ১০টার দিকে কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং গত রাতের নির্বাচনী সহিংসতার কিছু উদ্বেগজনক চিত্র।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই দেশের সাধারণ ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আজকের দিনটি অধিকার আদায়ের দিন। বাংলাদেশের মানুষ আজ তাদের পবিত্র ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা করতে যাচ্ছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মানুষ যদি নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে তাদের রায় দিয়ে যান, তবে দেশি-বিদেশি কোনো ষড়যন্ত্রই টেকসই হবে না। ব্যালটই হবে সব চক্রান্তের চূড়ান্ত জবাব।
ভোটের আগের রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটা বিশৃঙ্খলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সারা দেশের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো আমাদের হাতে আসেনি। তবে গত রাতে বিভিন্ন জেলা থেকে আমরা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত খবর পেয়েছি, যা একটি সুস্থ নির্বাচনের জন্য কাম্য নয়। তবে আমরা আশাবাদী যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে ছিল এবং তারা অনেক জায়গায় বিশৃঙ্খলা দমন করেছে। আমরা ভোররাত পর্যন্ত টেলিভিশন পর্দায় দেখেছি যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর ছিল। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে, তবে তাদের প্রথম কাজ হবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান অগ্রাধিকার।
দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে তারেক রহমান এক বিশেষ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনোভাবেই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ইনশাআল্লাহ, সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম দিন থেকেই আমরা নারীদের মর্যাদা, মূল্যায়ন এবং প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করব।
উল্লেখ্য, তাঁর ভোট দেওয়ার সময় স্ত্রী ও কন্যার উপস্থিতি এই বার্তারই এক প্রতীকী প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকা-১৭ আসনটি এখন সারাদেশের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এই আসনে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী, যা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরে দাঁড়ানোর পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
তারেক রহমানকে সমর্থন দিয়ে এই আসনের ৫ জন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারা হলেন এস এম আবুল কালাম আজাদ, মো. শামীম আহমদ, মুহাম্মদ রাশেদুল হক, মনজুর হুমায়ুন এবং কাজী এনায়েত উল্লাহ। এখনো যারা লড়াইয়ে আছেন তারা হলেন আতিক আহমেদ, তপু রায়হান, মোহাম্মদ উল্যাহ, কামরুল হাসান নাসিম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আনিসুজ্জামান খোকন। ঢাকা-১৭ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৯৮ জন যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭০ হাজার ১১৬ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ৮ জন। এই আসনে মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১২৪টি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ভোটগ্রহণ তো মাত্র শুরু হলো। শেষটা কেমন হবে তা এখনই বলা মুশকিল, তবে আমি ইনশাআল্লাহ জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।
তারেক রহমানের এই ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং তাঁর দেওয়া বক্তব্য বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। শুধু গুলশান নয়, তাঁর বগুড়া-৬ আসনের ভোটাররাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নির্বাচনী ফলাফলের জন্য। নির্বাচনের সার্বিক চিত্র এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকলেও কেন্দ্র দখল বা জালিয়াতি রোধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোর হুঁশিয়ারি কতটুকু কার্যকর হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে, এরপরই শুরু হবে চূড়ান্ত গণনা, যা নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্য।