দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে ফিরছে নির্বাচিত শাসনব্যবস্থা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর এখন চারদিকে সাজ সাজ রব। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিতে যাচ্ছে নতুন সরকার। কিন্তু এই নতুন অভিযাত্রার প্রাক্কালে একটি কৌতূহলী প্রশ্ন ডালপালা মেলছে কোথায় হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর ঠিকানা? দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, তিনি কি মায়ের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনে থাকবেন, নাকি ফিরে যাবেন রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে নির্ধারিত সরকারি বাসভবনে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই তোড়জোড় শুরু করেছে। গণভবন যেহেতু এখন ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তরিত হয়েছে, তাই বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ এবং মিন্টো রোডের ভিআইপি জোনকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
বিগত তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’কে তাঁর বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, তাঁরা যমুনাকেই নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে প্রস্তুত করছেন।
তিনি বলেন, ‘যমুনাকে আমরা নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুত রাখছি। অবকাঠামোগত সব ঠিকই আছে, তবুও নতুন প্রধানমন্ত্রীর যদি বিশেষ কোনো পছন্দ বা পরিবর্তন করার চাহিদা থাকে, আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
তবে যমুনা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানা হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। কারণ, এর আগে সংসদ ভবন চত্বরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকে একীভূত করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন করার একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সংসদ চলাকালীন প্রটোকল জটিলতার কারণে গত ডিসেম্বরে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। ফলে যমুনাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প।
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে গুলশানে তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ‘ফিরোজা’র পাশের একটি বাড়িতে (১৯৬ নম্বর বাড়ি) অবস্থান করছেন। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, আবেগ এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি গুলশানেই থাকতে পছন্দ করতে পারেন। তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
গুলশান একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর নিরাপত্তার জন্য যে ধরনের ত্রি-স্তরীয় বলয় প্রয়োজন, তা একটি আবাসিক এলাকায় নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া গুলশান থেকে সংসদ ভবন বা সচিবালয়ে যাতায়াতের সময় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াবে। এসব দিক বিবেচনা করে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাঁকে হেয়ার রোড বা মিন্টো রোড এলাকায় থাকার পরামর্শ দিতে পারে।
এদিকে কেবল প্রধানমন্ত্রী নয়, বিরোধী দলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত হেয়ার রোডের ২৯ নম্বর ভবনটিও ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। এই বাড়িটির একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৯১-৯৬ সাল পর্যন্ত (তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা) শেখ হাসিনা এবং ১৯৯৬ সালের জুন মাসে খালেদা জিয়া এই বাড়িতে উঠেছিলেন। তবে ২০০১ সালের পর থেকে দীর্ঘ দুই দশকে কোনো বিরোধী দলীয় নেতাকে এই সরকারি বাসভবনে থাকতে দেখা যায়নি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামী এখন প্রধান বিরোধী দল। তবে তাদের পক্ষ থেকে আগেভাগেই জানানো হয়েছে যে, জনগণের সেবকে পরিণত হতে চায় তারা। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনের আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তাঁরা রাষ্ট্রীয় গাড়ি বা বিলাসবহুল সরকারি বাড়ি ব্যবহার করবেন না। ফলে মিন্টো রোডের এই বিশাল বাংলোটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সরকার যেভাবে চাইবে, আমরা সেভাবেই সব সাজিয়ে দেব।’
১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে যখন শপথ অনুষ্ঠান শেষ হবে, তখনই পরিষ্কার হবে কোন কনভয়টি যমুনার দিকে যাবে আর কোনটি গুলশানের দিকে। আপাতত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে একটি গণতান্ত্রিক ভোরের, যেখানে বাসভবন ছাপিয়ে রাষ্ট্রনায়কের কর্মদক্ষতাই হবে প্রধান আলোচ্য বিষয়।