শেরপুরে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার রেশ ধরে আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিপক্ষ দলগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার বিষয়ে যারা সন্দিহান, তারাই এখন সন্ত্রাসের পথ বেছে নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ঢাকা-১৫ আসনের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন এবং জামায়াতের ‘মাল্টিমিডিয়া বাস’-এর ডিজিটাল প্রচারণা কার্যক্রমের শুভ সূচনায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন শফিকুর রহমান। শেরপুরের ঘটনাটি কিসের ইঙ্গিত দেয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, এই ঘটনা ইঙ্গিত করে অসহিষ্ণুতা। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে জনগণের ওপর আস্থা নাই। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে, অন্যের বিজয় দেখে নিজের সহ্য হয় না।
তিনি আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ময়দান যখন রক্তে রঞ্জিত হয়, তখন নির্বাচনী ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। জামায়াত এই ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে কেবল বর্তমান সংঘাত নিয়ে নয়, বরং ভবিষ্যতের রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে তাঁর দলের দর্শন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষায় আছি। নতুন বাংলাদেশ মানে ভূগোল বদলানো নয়, বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্রের পরিবর্তন। গত ৫৪ বছর ধরে যে জুলুম ও ফ্যাসিজম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে মুক্তি চায় জনগণ। আমরা চাই ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মানুষের যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার বিকল্প নেই।
নির্বাচনী প্রচারণার এই পর্যায়ে জামায়াতের আমির ১১ দলের সম্মিলিত কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান, বিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিবর্তনের সরকার গঠন করা হবে। তবে এর জন্য প্রথম ধাপে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে পুরোনো ফ্যাসিবাদী রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকতে দেশবাসীকে উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
শেরপুর-৩ আসনের সেই সংঘর্ষের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, চেয়ারে বসা নিয়ে একটি সামান্য বিতর্ক থেকে একজন শিক্ষকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। এটি মূলত প্রতিপক্ষকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক অশুভ চেষ্টা।
নির্বাচনী প্রচারণায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া দিতে জামায়াত ‘মাল্টিমিডিয়া বাস’ চালু করেছে। এই বাসের মাধ্যমে দলটির ডিজিটাল ইশতেহার ও উন্নয়নের রূপরেখা ভোটারদের সামনে তুলে ধরা হবে। মিরপুর-১০ এর পানির ট্যাংকি এলাকায় এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
শেরপুরের ঘটনাটি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের মিত্রতায় ফাটল ধরাবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে জামায়াতের আমিরের আজকের বক্তব্য এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তারা মাঠ ছাড়তে রাজি নয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই ধরণের সহিংসতা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।