বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার দামে এমন ‘মহালম্ফন’ আর কখনো দেখা যায়নি। আজ বৃহস্পতিবার সকাল গড়াতেই বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) যখন নতুন দামের ঘোষণা দিল, তখন হতবাক হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তারা। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রতি ভরি সোনার দাম বেড়েছে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা। এর ফলে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা—যা সর্বকালের রেকর্ড।
গত কয়েকদিন ধরেই সোনার বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছিল, কিন্তু আজকের বৃদ্ধি সব কল্পনাকে হার মানিয়েছে
মঙ্গলবার: ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বৃদ্ধি।
বৃহস্পতিবার (আজ): ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বৃদ্ধি।
অর্থাৎ, গত ৭২ ঘণ্টায় ভরিপ্রতি সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ২৯ হাজার টাকা। যে গতিতে দাম বাড়ছে, তাতে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই সোনার দাম ৩ লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করবে।
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি’ বা পাকা সোনার সংকট এবং বিশ্ববাজারে আকাশচুম্বী মূল্যের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে এর গভীরে রয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতির অনিশ্চয়তা।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম আজ সাড়ে ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন শেয়ার বাজার বা মুদ্রার চেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা মজুত করছেন।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর ও ভূ-রাজনীতি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন বাণিজ্য নীতি এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তজনার ফলে বিশ্ববাণিজ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে সোনার দাম শীঘ্রই ৭ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় মুদ্রার মান: ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া এবং আমদানিতে কড়াকড়ির কারণে দেশে সোনার সরবরাহ কমেছে, যা দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
সোনার দামের এই ঊর্ধ্বগতি গত পাঁচ বছরে কীভাবে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতাকে পিষ্ট করেছে, তার একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
জুলাই ২০২৩: প্রথমবারের মতো ১ লাখ টাকা স্পর্শ।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫: ১.৫ লাখ টাকার ঘর অতিক্রম।
অক্টোবর ২০২৫: ২ লাখ টাকার মাইলফলক।
জানুয়ারি ২০২৬ (বর্তমান): ২.৮৬ লাখ টাকা।
এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের জুয়েলারি শিল্প এক বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। ঢাকার তাঁতীবাজার ও বায়তুল মোকাররমের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, শোরুমে ক্রেতা আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যারা আগে বিয়ের গয়না বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা এখন হয় গয়নার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন অথবা পুরনো সোনা গলিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এখন ১০ ভরি সোনা দিয়ে বিয়ে দেওয়া মানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ধাক্কা। এটি সামাজিক এবং পারিবারিক কাঠামোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বা যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সোনা কিনে রাখেন। কারণ কাগজের মুদ্রার মান কমলেও সোনার আবেদন কখনো কমে না। বর্তমানের এই ১৬ হাজার টাকার রেকর্ড বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, বিশ্বজুড়ে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক পালাবদল বা মন্দার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা সোনাকে এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদে পরিণত করেছে।
বাজুসের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, তারা নিরুপায় হয়ে এই দাম বাড়িয়েছেন। স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার সংকট এতটাই প্রকট যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় না করলে পাচার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাদের মতে, সরকার যদি আমদানি প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও নমনীয়তা না আনে, তবে সামনের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের পক্ষে গয়না কেনা অলীক স্বপ্নে পরিণত হবে।
এক দিনে ১৬ হাজার টাকা বৃদ্ধি কেবল একটি সংবাদ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর দশা এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি। ৩ লাখ টাকা ভরি হওয়ার পথে সোনা এখন কেবল অলঙ্কার নয়, বরং একটি দুষ্প্রাপ্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। যারা বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এটি সুযোগ হতে পারে; কিন্তু যারা সাধারণ ভোক্তা, তাদের জন্য এটি চরম দুঃসংবাদ।
স্বর্ণবাজারের এই রেকর্ড ভাঙার খেলা কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখন নির্ভর করছে ওয়াশিংটন থেকে তেহরান পর্যন্ত বিস্তৃত রাজনৈতিক কূটনীতির ওপর।