পবিত্র রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটল। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের স্বস্তি দিয়ে পুরো রমজান মাস মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই পবিত্র মাসে সরকারি ও বেসরকারি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই ক্লাস চলবে না।
রোববার বিচারপতি ফাহমিদা ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে রমজানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও ধর্মীয় কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার অবসান হলো।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে দীর্ঘ শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. ইলিয়াস আলী মন্ডল ও অ্যাডভোকেট তানজিনা ববি লিজা। শুনানিতে তারা রমজান মাসে স্কুল খোলা রাখার নেতিবাচক প্রভাবগুলো যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করেন।
রিটকারী পক্ষের মূল যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ নাগরিক মুসলিম এবং স্বাধীনতার পর থেকেই রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রথা ও রীতিতে পরিণত হয়েছে। সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের প্রথা ও রীতিও আইনের মর্যাদা পায়। তাই হঠাৎ করে রমজানে স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর পুরো রমজান মাস নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার বিষয়ে এই আদেশ জারি করেন।
এই আইনি প্রক্রিয়ার শুরু হয়েছিল চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি। তখন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইলিয়াস আলী মন্ডল পবিত্র রমজান মাসে স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশনা চেয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের বরাবরে এই নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
নোটিশে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং রমজানের ধর্মীয় গাম্ভীর্যের কথা বিবেচনা করলে কোমলমতি শিশুদের জন্য সারাদিন স্কুলে যাতায়াত ও ক্লাস করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এতে তারা রোজা রাখার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যেতে পারে। নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করেন।
ধর্মীয় চর্চায় বিঘ্ন: কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই রোজা রাখতে উৎসাহিত হয়। কিন্তু প্রখর রোদ আর দীর্ঘ সময়ের ক্লাস শেষে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যা তাদের ধর্মীয় আচার পালনে অন্তরায় সৃষ্টি করে।
তীব্র যানজট: রমজান মাসে এমনিতেই রাজপথে মানুষের চাপ বেশি থাকে। স্কুল খোলা থাকলে হাজার হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা রাস্তায় নামে, ফলে শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে রোজাদারদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
পারিবারিক বন্ধন: রমজান মাসটি পরিবারের সাথে কাটানোর এবং ইবাদত করার সময়। স্কুল খোলা থাকলে শিক্ষার্থীদের জীবন যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, যা এই ধর্মীয় উৎসবের আমেজকে ম্লান করে দেয়।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর অভিভাবক মহলে আনন্দের লহরী বয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হতে পারে। এই গরমে বাচ্চাদের জন্য স্কুল করা খুব কঠিন হতো। হাইকোর্টের এই রায় আমাদের জন্য বড় স্বস্তির খবর।’
শিক্ষকরাও মনে করছেন, রমজানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এমনিতেই কমে যায়, তাই বন্ধের সিদ্ধান্তটি বাস্তবসম্মত। তবে পাঠদানের যে ক্ষতি হবে, তা পরবর্তীতে অতিরিক্ত ক্লাসের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে বলে তারা মত দেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে উচ্চ আদালতের এই রায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, জনস্বার্থ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে বিচার বিভাগ সর্বদা সজাগ। আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরো রমজান মাস জুড়ে দেশের সব নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন ছুটির আমেজে থাকবে, যা শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠুভাবে রমজান পালনে সহায়তা করবে।