দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা অনলাইন স্ক্যাম এবং সাইবার অপরাধের সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বেইজিং। এরই ধারাবাহিকতায় মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ত্রাস হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত ‘বায়’ (Bai) মাফিয়া পরিবারের আরও চার শীর্ষ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে চীন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
চীনের গুয়াংডং প্রদেশের একটি উচ্চ আদালত প্রতারণা, ঠাণ্ডা মাথার খুন এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে এই রায় প্রদান করে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত অঞ্চলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে কেউ পার পাবে না—বেইজিং এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে সেটিই বুঝিয়ে দিলো।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের শান রাজ্যের সীমান্তবর্তী শহর ‘লাউক্কাইং’ ছিল এই মাফিয়াদের অভয়ারণ্য। সেখানে ক্যাসিনো, যৌনপল্লি এবং সাইবার প্রতারণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল বায় পরিবার। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত মিলিশিয়া বাহিনী ব্যবহার করে ৪১টি বিশাল কম্পাউন্ড নিয়ন্ত্রণ করতো।
নির্যাতন কক্ষ: প্রতারণা কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে জিম্মি করে রাখা হতো। যারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারতো না বা পালানোর চেষ্টা করতো, তাদের ওপর চলতো অমানবিক নির্যাতন।
ক্ষয়ক্ষতি: বায় পরিবারের এই সাইবার সাম্রাজ্যের কারণে কমপক্ষে ছয়জন চীনা নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং একজন অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া অগণিত মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
সাজা: আদালত বায় পরিবারের ২১ জন সদস্য ও সহযোগীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এর মধ্যে পরিবারের প্রধান বায় সুওচেং গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ায় তাঁর দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
২০২৩ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় মাফিয়াদের এই মধুচন্দ্রিমা নির্বিঘ্নে চললেও পরিস্থিতি বদলে যায় যখন বেইজিং সরাসরি হস্তক্ষেপে নাম দেয়। অনলাইন স্ক্যামে লাখো চীনা নাগরিক সর্বস্বান্ত হওয়ায় ক্ষুব্ধ চীন মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। এর ফলে বায় ও মিং পরিবারের মতো বড় বড় অপরাধী চক্রগুলোর পতন ঘটে এবং তারা চীনের হাতে ধরা পড়ে।
এর আগে গত সপ্তাহে ‘মিং’ মাফিয়া পরিবারের ১১ জন সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এসব মাফিয়াদের অপরাধ নিয়ে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
জাতিসংঘের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা চক্রে কাজ করতে বাধ্য করার জন্য লক্ষাধিক মানুষকে পাচার করা হয়েছে। এদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ চীনের সাধারণ নাগরিক, যাদের ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এসব সাইবার কম্পাউন্ডে বন্দি করা হতো।
মিয়ানমার সীমান্তের এই মাফিয়া পরিবারগুলোর দম্ভ চূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে চীনের শক্ত অবস্থান ফুটে উঠেছে। বেইজিংয়ের এই ‘আয়রন ফিস্ট’ নীতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য স্ক্যাম সেন্টারগুলোর জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা।