পবিত্র মাহে রমজান সংযম, ত্যাগ এবং আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত মাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় রমজানের আগমনী বার্তা বেজে উঠতেই দেশবাসীসহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রোববার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিশেষ বার্তায় তিনি এই শুভেচ্ছা জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের রমজান বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বার্তায় কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং রমজানের অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
শুভেচ্ছা বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উল্লেখ করেন যে, রমজান মাস কেবল উপবাসের নাম নয়, এটি মূলত আত্মসংযম, ত্যাগ এবং সহমর্মিতার এক অনন্য পাঠশালা। তিনি বলেন, এই মহিমান্বিত মাসে সিয়াম সাধনা, দান-সদকা ও নিবিড় ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পায়।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বার্তায় জোর দিয়ে বলেন, ‘রমজান আমাদের পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের সুযোগ করে দেয়। একইসঙ্গে এটি পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করার মাস।’
এবারের রমজান এমন এক সময়ে আসছে যখন দেশ একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে রমজানের শিক্ষাকে জাতীয় জীবনের বৃহত্তর ক্যানভাসে তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মাহে রমজান আমাদের অন্যায়, দুর্নীতি এবং অবিচার পরিহার করার শক্তি জোগায়।
বার্তায় তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন,‘পবিত্র রমজান আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় একটি ন্যায় ও কল্যাণভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার। এটি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়, বরং সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সততা চর্চার মাধ্যমে নৈতিকতা ও মানবিকতার উচ্চ শিখরে পৌঁছানোর সোপান। এই মাস আমাদের মধ্যে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে, যা একটি আদর্শ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।’
সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও ভোগবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা রমজানের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল প্রকার বিলাসিতা, হিংসা-বিদ্বেষ এবং পরশ্রীকাতরতা পরিহার করি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, তওবা এবং সৎকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি আরও বলেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। সমাজে শান্তি বজায় রাখা এবং একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়াই হোক এবারের রমজানের অঙ্গীকার।
শুভেচ্ছা বার্তার শেষ অংশে ড. মুহাম্মদ ইউনূস মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে বিশেষ প্রার্থনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সৃষ্টিকর্তা যেন সবার রোজা, নামাজ এবং দান-সদকাসহ সকল নেক আমল কবুল করেন।
তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ আমাদের জীবনে মাহে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা কার্যকর করার তাওফিক দান করুন। তিনি আমাদের সকলকে ক্ষমা ও হেফাজত করুন এবং এই প্রিয় দেশ ও জাতিকে শান্তি ও টেকসই সমৃদ্ধি দান করুন। আমিন।’
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি যখন নতুন নির্বাচিত সরকার শপথ নিতে যাচ্ছে, তার ঠিক আগমুহূর্তে প্রধান উপদেষ্টার এই বাণী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. ইউনূস তাঁর এই বার্তার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবিক শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন যা গত জুলাই বিপ্লবের মূল দাবি ছিল।
পবিত্র রমজান উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে ইতোমধ্যে এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা থেকে সিলেট সর্বত্রই মানুষ প্রস্ততি নিচ্ছে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য। প্রধান উপদেষ্টার এই শুভেচ্ছা বার্তা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে নতুন উৎসাহ ও দায়িত্ববোধের সঞ্চার করেছে।