বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ও ইতিবাচক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্তকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে নির্বাচনে জয়ী দল বিএনপি।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এই অবস্থান পরিষ্কার করেন।
তিনি মনে করেন, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা যদি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদাভাবে ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ করে সরকারের কাজের তদারকি করে, তবে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। বিএনপি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় এবং আশা করে এর মাধ্যমে রাজপথের সংঘাতের বদলে সংসদে তর্কের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা। যেখানে বিরোধী দলের সদস্যরা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ছায়া দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে বিকল্প নীতিমালা উপস্থাপন করেন। আগামীকাল মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকায় এবং বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্যকে শপথ পাঠ করাবেন। এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর এখতিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, বিদ্যমান সংবিধানে এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই। যদি সংবিধান সংশোধন করে এই পরিষদের শপথের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং কে শপথ করাবেন তা সুনির্দিষ্ট করা হয়, তবেই এটি সম্ভব হতে পারে। একই স্থানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিগত দেড় দশকে দেশের প্রতিটি বিভাগ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার পথে, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আমাদের সামনে প্রতিটি সেক্টরেই বিশাল চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হবে এই ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোকে মেরামত করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
মন্ত্রিসভার আকার বা সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো চূড়ান্ত তালিকা সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে খুব শিগগিরই দেশবাসী একটি দক্ষ ও দেশপ্রেমিক মন্ত্রিসভা দেখতে পাবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভাকে স্বাগত জানানো একটি বড় মনের পরিচয় এবং উদার রাজনীতির ইঙ্গিত।
এর মাধ্যমে তারা একটি বার্তা দিতে চাচ্ছে, তারা কেবল শাসন করতে নয় বরং জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতেও প্রস্তুত। অন্যদিকে সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের আইনি সতর্কতা ইঙ্গিত দেয়, নতুন সরকার প্রতিটি পদক্ষেপেই সংবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চায়।
আগামীকাল বিকেল ৪টায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। একদিকে নির্বাচিত সরকারের কর্মতৎপরতা আর অন্যদিকে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভার কড়া নজরদারি, এই দুইয়ের মেলবন্ধনে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র কতটুকু প্রাণবন্ত হয় সেটিই এখন দেখার বিষয়।