আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন টানটান উত্তেজনায় মুখর। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবই এখন নির্বাচনী জ্বরে আক্রান্ত। বিশেষ করে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের শীর্ষ দুই নেতা, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান-এর বাগযুদ্ধ এখন তুঙ্গে। কে হচ্ছেন আগামী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী? এই প্রশ্নই এখন ঘুরে ফিরছে কোটি ভোটারের মনে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এক অগ্নিপরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পাল্টে গেছে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখন চূড়ান্ত প্রচারণায় ব্যস্ত। তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বৈরথ।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক নজিরবিহীন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে তারেক রহমানের উপস্থিতি লাখ লাখ মানুষের ঢল নামাচ্ছে। তার প্রধান স্লোগান—’টেক ব্যাক বাংলাদেশ’।
তারেক রহমান তার বক্তৃতায় বারবার জোর দিচ্ছেন জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার এবং সুশাসনের ওপর। তিনি বলছেন, ১২ তারিখের নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের দিন। তারেক রহমান প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বেকারত্ব দূরীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তাকে এই দৌড়ে ‘ফ্রন্ট রানার’ বা সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে অভিহিত করছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার সুশৃঙ্খল দল এবং ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য নিয়ে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তার বক্তৃতায় ফুটে উঠছে এক ‘বেইনসাফি-মুক্ত’ বাংলাদেশের স্বপ্ন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ১২ তারিখ দেশে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে।
জামায়াত আমিরের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হলো দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলছেন, আল্লাহ যদি আমাদের সেবকের দায়িত্ব দেন, তবে বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটিতেও কেউ চাঁদাবাজি বা ঘুষ খাওয়ার সাহস পাবে না। তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের আকর্ষণ করতে জামায়াত তাদের ইশতেহারে কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।
নির্বাচনের তারিখ যত কাছে আসছে, দুই নেতার মধ্যকার বাগযুদ্ধ ততই তীব্র হচ্ছে। তারেক রহমান যেখানে বিএনপিকে অভিজ্ঞ দল হিসেবে শাসনের জন্য যোগ্য মনে করছেন, সেখানে ডা. শফিকুর রহমান দাবি করছেন যে অতীতে যারা ব্যর্থ হয়েছে, মানুষ আর তাদের দিকে ফিরে তাকাবে না।
সম্প্রতি তারেক রহমান জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে নারী নেতৃত্ব এবং উন্নয়নের অন্তরায় নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা হচ্ছে। পাল্টা জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, কোনো একক দলের আধিপত্য নয়, বরং ইনসাফ কায়েমই হবে এই নির্বাচনের মূল জয়।
বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জরিপ সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতি জনসমর্থন তুঙ্গে দেখা যাচ্ছে। টাইমস ম্যাগাজিন এবং দ্য ইকোনমিস্ট-এর মতো সাময়িকীগুলো তাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শীর্ষস্থানে রেখেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪৭% থেকে ৭০% মানুষ তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখছেন।
তবে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের রয়েছে বিশাল একটি নীরব ভোটার ব্যাংক। বিশেষ করে ধার্মিক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার জনগণের মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। যদিও জনমত জরিপে তারা বিএনপির চেয়ে পিছিয়ে, তবুও নির্বাচনের ফলাফলে তারা বড় ধরনের ‘কিংমেকার’ বা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের সাধারণ ভোটাররা এখন উন্নয়নের চেয়েও বেশি চান শান্তি ও স্থায়িত্ব। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ১২৭ মিলিয়নেরও বেশি ভোটার এবার ঠিক করবেন কার হাতে থাকবে আগামীর বাংলাদেশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বিএনপির বিশাল এক সক্রিয় জনশক্তি। তার ফিরে আসা দলের মধ্যে যে সংহতি তৈরি করেছে, তা ভোটে বিশাল প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, ডা. শফিকুর রহমানের পেশাদার ভাবমূর্তি এবং জামায়াতের সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কি তারেক রহমান তার ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ মিশন সফল করবেন, নাকি ডা. শফিকুর রহমানের ‘নতুন ইতিহাস’ সৃষ্টির স্লোগান জয়ী হবে তার উত্তর মিলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার পর। তবে এই দুই নেতার দ্বিমুখী লড়াই যে বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে বদলে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।