নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, নারী নির্যাতন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের ওপর হামলার খবর আসার পর তিনি জনগণকে সাথে নিয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আজ রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই উদ্বেগ জানান। একইসাথে একটি ‘বিশেষ দলের’ উশৃঙ্খল আচরণের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জামায়াত আমির তাঁর ফেসবুক পোস্টে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন যে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভাই-বোনদের ওপর হামলার খবর আসছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অপরাধে অনেক জায়গায় নারীদের শ্লীলতাহানির মতো ন্যাক্কারজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনোত্তর পরিবেশে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাই-বোনদের ওপর একটি বিশেষ দলের কিছু উশৃঙ্খল আচরণ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, এমনকি আমাদের সম্মানিত নারীদের শ্লীলতাহানির খবর আমাদের কাছে আসছে। এটি মানবতার চরম অবমাননা।’
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করবে না। যেখানেই সাধারণ মানুষ বা নেতা-কর্মীরা আক্রান্ত হবে, সেখানেই জনগণকে সাথে নিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ন্যায় ও সত্যের ওপর ইনশাআল্লাহ আমরা অটল থাকব। কোনো অপশক্তির কাছে আমরা মাথা নত করব না। যেখানেই এ ধরনের আঘাত আসবে, জনগণকে সাথে নিয়ে মজলুমের পাশে দাঁড়িয়ে সেখানেই তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
দলের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রতি জামায়াত আমিরের বিশেষ আহ্বান ছিল বিপদে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তিনি এই কাজকে কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ইমানি দায়িত্ব হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণ জনগণের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ান। মনে রাখবেন, এটি মানবতার দাবি, মহান আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি এবং দেশকে ভালোবাসার দাবি। এই দাবি পূরণে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
তিনি আরও সতর্ক করে দেন যে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। জামায়াত আমিরের এই কড়া বার্তা মূলত বিজয় উদযাপন করতে গিয়ে উশৃঙ্খলতায় মেতে ওঠা রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কবাণী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনে বিএনপি জোট নিরঙ্কুশ জয় পেলেও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে ভোটের পর পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এনসিপি ও জামায়াত কর্মীদের বাড়িঘরে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সারজিস আলমও আজ সকালেই একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন। জামায়াত আমিরের আজকের এই ঘোষণা সেই উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করল।
আগামী মঙ্গলবার নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। তার আগেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তির প্রধানের এই কড়া অবস্থান নতুন প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমানের এই বার্তা প্রমাণ করে যে, এবারের সংসদে বিরোধী দল কেবল নামমাত্র থাকছে না, বরং মাঠের রাজনীতিতেও তারা সক্রিয় ও শক্ত অবস্থান নিতে যাচ্ছে। সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিহিংসা বন্ধে নতুন সরকারের ভূমিকা এখন দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।